আমি বৃষ্টিবিলাসী লোক। পৃথিবীর যে কয়েকটি জিনিস আমার ভালো লাগে তার মধ্যে বৃষ্টি অন্যতম। আর গ্রামে বৃষ্টিদিন মানে মনোমুগ্ধকর ব্যাপার্। ২০০২ সালের পর বর্ষাকালে আর গ্রামের বাড়ি যাওয়া হয় নাই। কাঁদা পানির ভয়ে যেতাম না। এখন সেই কাঁদা পানিকেই মিস করছি।
আষাড়ের মধ্যভাগে সারা গ্রাম জেগে ওঠে। মাঠে মাঠে তখন বীজতলা তৈরীর ধুম। লাঙল গরু জুড়ে মাঠে নেমে পড়েছে সবাই। হটহট করে গরু তাড়াচ্ছে কেউ। বৃষ্টির পানিতে মাটির বুক নরম হয়ে আছে। সেই বুকে লাঙলের ফলা চেপে ধরে আছে কৃষক।
বাড়ির পুকুরে বাঁশের তৈরী বড় বড় ঝুড়িতে বীজধান ভিজিয়ে রাখা হয়। দুই দিনের মধ্যেই ধানের অংকুর গজিয়ে যায়। অংকুর গজানো ধানকে আমরা কল গজানো ধান বলি। বীজতলাকে বলি চাতর্। চাতর তৈরী হয়ে যাওয়ার পরে কলানো ধান ছিটিয়ে দেয়া হয় । কয়েকদিন না যেতেই সবুজ ধানের চাদরে ঢেকে যায় চাতরের বুক। সেই সবুজের দিকে তাকিয়ে কৃষক প্রশান্তি বোধ করে।
আমি তখন অনেক ছোট। প্রাইমারী স্কুলে পড়ি। বর্ষার ছুটিতে গ্রামের বাড়ি চলে গেছি। পশ্চিম বিলে আমাদের চাতর তৈরী করা হচ্ছে। চাচারা জমি চাষ দিচ্ছে। আমি পাশের জমির পানির মধ্যে আসন গেড়ে বসে মাছের ছোট ছোট পোনা ধরায় ব্যস্ত। দাদা বারবার সতর্ক করছেন, ' ওইরাম করে পানির মদ্যি জাবড় কাইটে বসিসনে। জোঁক '। কে শোনে কার কথা। আমি তখন খেলায় ব্যস্ত।
দুপুরে দাদার হাত ধরে বাড়ি ফিরে এলাম। তখন আমরা যে হাফপ্যান্ট পরতাম সেগুলোকে বলা হত ইংলিশ প্যান্ট। পুকুরপাড়ে এসে মনে হলো রানের চিপায় কুটকুট করছে। প্যান্টের জিপার খুলে দেখি বিশেষ জায়গার পাশে ইয়া মোটা এক জোঁক ঝুলে আছে। আমি তো প্যান্ট খুলে লাফাতে লাগলাম। আর সেই সাথে গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করতে লাগলাম। এক কাকা এসে জোঁকটা ছাড়িয়ে দিলো। কতক্ষণ ধরে খেয়েছে কে জানে। ফুলে ঢোল হয়ে আছে। বাড়ি থেকে একমুঠ নুন এনে জোঁকের মুখে ঠেসে দিলাম। সমস্ত রক্ত উগরে দিয়ে জোঁকটা এতটুকু হয়ে গেলো। রক্তচোষাদের এভাবেই শাস্তি দেয়া উচিত।
এরপর দীর্ঘদিন আমি জোঁকের ভয়ে পুকুরে নামতাম না। পানি তুলে ডাঙায় দাঁড়িয়ে গোছল করতাম।
Post a Comment