মহাকাল (ত্রয়ী গল্প)

বিশ্বযুদ্ধ
সবুজ ঘাসের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলেছে সুশান্না। সুশান্না হুদাস। চির পরিচিত গাছগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছে। কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। গুলির বেগে ছুটে চলেছে সে। দূরে কোথাও গুলির আওয়াজ শোনা গেলো। শব্দ শুনে একটা পাখি ডানা ঝাপটে উড়াল দিলো আকাশে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। মিত্র বাহিনীর সাথে অক্ষ বাহিনীর প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। সম্মুখসমরে জার্মান বাহিনীর হাতে পোলিশ বাহিনী পর্যুদস্ত প্রায়। সুশান্নাদের গ্রামের নাম জিয়েলোনা গোরা। পোলিশ ভাষার এই শব্দের অর্থ সবুজ উপত্যকা। এলাকাটা নামকরণের স্বার্থকতা বহন করছে। সবুজ ঘাসের চাদরে আবৃত পুরো উপত্যকা। সাদা কাটা ছোপ আঁকা গরুগুলো আপন মনে ঘাসে মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়োলোনা গোরা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। দুগ্ধ খামার, ফসল চাষ করে প্রতিটি পরিবার সুখে আছে সেটা বাড়ি ঘরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। সুশান্নাদেরও বেশ বড় খামার আছে। সুশান্নার বড় ভাই জ্যাকব আর্মিতে চাকরি করে। করতেন। গত সপ্তাহে খবর এসেছে জ্যাকব যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। সুশান্নার বাবা সলোমন হুদাস পরিবারের বড় সন্তান যুদ্ধে যাক এটা কিছুতেই মানতে চায় নাই। তাদের যে জোতজমি আছে, গরুর খামার আছে তাতে একটা ছেলের দিব্যি চলে যাবে। চাকরি করতে যাওয়ার দরকার কি আছে! কিছু জ্যাকব, সুশান্নার বড় ভাই কারো কোন কথাই শুনলো না। জ্যাকব সেনাবাহিনীতে গেছে দুই শীত আগে। এই গ্রীষ্মে জ্যাকবের বাড়ি আসার কথা ছিলো। তার আগেই শুরু হলো পোড়ার যুদ্ধ। গ্রীষ্ম এলো কিন্তু জ্যাকব এলো না। এলো তার মৃত্যু সংবাদ।

সুশান্নাদের গ্রামে যুদ্ধ হয়ে গেছে। দিন রাত সারাক্ষণ মেশিন গানের ঠাঠা শব্দে কানে তালা লাগার যোগাড়। সলোমন সবাইকে নিয়ে গোলাঘরে লুকিয়ে রইলো। তাদের বাড়ির ধারে কাছে যুদ্ধ হয় নাই। কিন্তু কোথা থেকে অনবরত গুলি ছুটে আসতে লাগলো। দেয়ালের গাঁয়ে ঠুসঠাস করে বিঁধতে লাগলো। গুলি খেয়ে খামারের অর্ধেক গরু মরে গেলো। পোলিশেরা পিছু হটে চলে গেছে। পুরো এলাকা এখন জার্মান সৈন্যদের দখলে। খুঁজে খুঁজে ইহুদি বাড়ি গুলোতে হাজির হচ্ছে। পাখির মত গুলি করে মারছে। সুশান্না জানে না খ্রিষ্টান জার্মানদের কেন এই ইহুদি বিদ্বেষ। পোলিশ ইহুদিরা জার্মান খ্রিস্টানদের কি ক্ষতি করেছে? সলোমন হুদাস অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো পরিবার নিয়ে পালিয়ে যাবে। রাজধানী এখনো পোলিশদের দখলে আছে। সেদিকেই যাওয়া যাক। তারপর যা হবার হবে। নিঃশব্দে ব্যাগ পত্তর গোছাচ্ছে ওলগা। বাড়িটা পোড়া বাড়ির মত খাঁ খাঁ করছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কেউ আছে। এমন সময় গাড়ীর চাকার শব্দ পাওয়া গেলো। জানালা দিয়ে দেখা গেলো সবুজ ঘাসের বুক চিরে যে রাস্তা, সেই রাস্তায় হলুদ ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসছে একটি আর্মি জিপ। তাদের দরজার সামনে এসেই থামলো। সলোমনের গলা শুকিয়ে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগে দরজায় টোকা পড়লো। সুশান্নার মা ওলগা সুশান্নাকে রান্নাঘরের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিলো। বলে দিলো, ‘মা আমাদের যাই হোক তুমি যেভাবেই পারো নিজেকে রক্ষা করোপেছনের দরজাটা ঠিক দরজা নয়। মেঝে দিয়ে একটা সূড়ঙ্গ পথের মত। ছোটবেলায় সুশান্নারা এই পথ দিয়ে চোর পুলিশ খেলতো। সুশান্না সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হতেই গুলির শব্দ শোনা গেলো। আর সেই সাথে কেউ কাঠের মেঝেতে পড়ার শব্দ হলো। সুশান্নার মা হেলেনার আর্তচিৎকার শোনা গেলো। পরমূহূর্তেই সেটা থেমে গেলো। সুনশান নিস্তব্ধতা। কাঠের মেঝেতে আর্মি বুটের মচমচ শব্দ। সুশান্না সুড়ঙ্গ বেয়ে বাড়ির পেছনের অংশে বেরিয়ে এলো। মুহূর্তকাল সে হতবিহ্বল হয়ে রইলো। কি করা উচিত তার! বাবা মার কাছে ফিরে যাবে! আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইলো। গ্রীষ্ম সকালের আকাশে সাদা সাদা তুলোর মত মেঘ। সুশান্না কিছু না ভেবেই ছোটা শুরু করলো। সবুজ ঘাসের মাঠ পেছনে ছুটতে শুরু করছে। সুশান্না ছুটছে। ইহুদি সুশান্না।

অধর্মযুদ্ধ
১৯৪৭ সাল। অস্থির এক আগুনে পুড়ছে সমগ্র ভারতবর্ষ। করাচি, লাহোর, দিল্লী , কলকাতা , ঢাকাকোন বড় শহরই বাদ পড়েনি । সেই আগুনের হলকা এসে লেগেছে সুলতানাদের বাড়িতে। সুলতানাদের গ্রামের নাম ভূবনপাল্লি। খ্রিষ্টীয় ১০ শতকের এক শাসক চালুক্য ত্রৈলক্য মাল্লা ভূবনেশ্বরার নামে এই গ্রামের নামকরণ করা হয়। বহু শতাব্দী প্রাচীন এই গ্রামের অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু। কিছু মুসলমান, শিখ, জৈনও আছে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের সেকেন্দারাবাদের এই গ্রামে সকল ধর্মের সকল মতের মানুষ মিলে মিশেই বাস করে এসেছে এতদিন। কিন্তু খ্রিষ্টান ব্রিটিশের ডিভাইড রুলে আজ হিন্দু মুসলমান পুরো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।

শাওয়াল মাসে সুলতানার বিয়ে। কিশোরী সুলতানার চোখে এখন রঙিন স্বপ্ন। যার সাথে সুলতানার সাদি ঠিক হয়েছে তাকে সে চেনে। সুলতানা যখন বোরখায় শরীর ঢেকে সহেলিদের সাথে মাদ্রাসায় যায় তখন গলির মুখে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে সুদর্শন এই যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে। আলীর উচ্চতা ছ ফুটের কাছাকাছি। সবুজ রঙের পাঞ্জাবীতে মানিয়েছে বেশ। ঘন কালো বাবরি চুল কানের পাশে নেমে এসেছে। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। সুলতানা নিজে ধবধবে ফর্সা। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ সুলতানার খুব পছন্দ।

নেকাবে ঢাকা সুলতানার পুরো মুখ। শুধু পটলচেরা চোখ দুটি দেখা যায়। চকিতে সেই চোখে চোখাচোখি হয়ে গেল। সুলতানা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো। আরো কয়েকবার আলীকে দেখা গেলো গলির মুখে। আলীর বাড়ি পাশের গ্রামে। তিরুমালাগিরি। তিরুমালাগিরি, ভূবনপাল্লি এবং আলওয়াল এই তিনটি বড় গ্রাম নিয়ে সেকেন্দ্রাবাদ গঠিত। সপ্তাহ না পেরোতেই আলীর মুরুব্বীরা আব্বাজানের কাছে বিবাহের পয়গাম নিয়ে এলো। আব্বাজান, মিয়াভাই ইসমাইল সবাই রাজি। শাওয়াল মাসের শেষ জুমা শাদির দিন ঠিক করা হয়েছে। সুলতানার সেহেলিরা নিকাহের বিভিন্ন কথা বার্তা বলে অস্থির করে তুলেছে।

এরই মধ্যে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। আব্বাজান বলছেন, মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান বলে আলাদা একটা দেশ তৈরী করা হচ্ছে। হিন্দুস্তানের সব মুসলমানদের সেখানে চলে যেতে হবে। লাহোর করাচির ওদিকে। আম্মিজান ফাতিমা শুনে আঁতকে ওঠেন। এই ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবেন! সেই অজানা অচেনা পাকিস্তান কিভাবে আমাদের দেশ হবে! সুলতানাও ভাবে। অনেক অনেক ভাবে। এই চিরচেনা বাড়ি , ওই খোলা আকাশ সব ছেড়ে সে কিভাবে যাবে! আচ্ছা, সেই পাকিস্তানের আকাশ কি এই হায়দ্রাবাদের আকাশের মত সুন্দর। সেখানকার আকাশেও কি মেঘেরা পেখম মেলে বাদল দিনে নৃত্য করে। ওখানকার মানুষেরাও কি হায়দ্রাবাদের মত তেলেগুভাষী। সুলতানা তেলেগু ছাড়া হিন্দী উর্দু বুঝতে পারে না। সে খুব পেরেশানী বোধ করে।

খুন এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিদিন কোন না কোন বাড়ি খুন হচ্ছে। হিন্দু মুসলমান একে অন্যকে ধর্মরক্ষার নামে খুন করছে। একজন চাকু বসাচ্ছে তো অন্যজন গলা কাটছে। আজ খুব কাছেই চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। আব্বাজান বললেন, “না আর থাকা যাবেনা। ফাতিমা, সুলতানা তোমরা গুছিয়ে নাও

দরজায় জোরে ধাক্কানোর শব্দ শোনা গেলো। ঘরের সবাই আঁতকে উঠলো। আব্বাজান কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন , “কে?”

'আমি আলী।আলীর গলা শোনা গেলো।

আব্বাজান দরজা খুলে আলীকে ঘরে ঢোকালেন। ইসমাইল জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ব্যাপার আলী, পরিস্থিতি খারাপ, এর মধ্যে তুমি বাইরে কেন?’

আলী সংকোচ বোধ করে। সে কেন ছুটে এসেছে জানে না। 'শুনলাম আপনাদের এদিকে হিঁদুরা আক্রমন করেছে। খুব পেরেশানি লাগছিলো। থাকতে না পেরে ছুটে চলে এলাম।'

আব্বাজান বললেন, ‘ এই অবস্থায় বাইরে বের হওয়া তোমার মোটেও উচিত হয়নি

ফাতিমা মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। বিয়ের আগেই জামাই তার মেয়েকে এত ভালবাসে। মেয়ে তার রানীর হালে জীবন কাটাবে ফাতিমা এ যে দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছে। ফাতিমার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরে পড়তে লাগলো।

আলী কিছু আগে চলে এসেছে। দাঙ্গাকারীরা তার পরে এসে পৌছায়। সুলতানাদের মজবুত দরজা ভেঙ্গে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। হুড়োহুড়ির ভিতরে ফাতিমা কিভাবে যে সুলতানাকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বলতে পারবে না। কোথায় যাবে সে? বাড়ির পাশের জলাধারে নেমে যায় সে। সুলতানা মায়ের হাত ধরে নেমে যায়। জলাধারের এক পাশে পানির উপর ঝোপের মত হয়ে আছে। ফাতিমা মেয়েকে নিয়ে সেই ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নিলো।

আব্বাজান, ইসমাইল, আলীকে দাঙ্গাকারীরা ধরে ফেলেছে। তাদের হাত পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা। আলীর চোয়ালের একপাশ দিয়ে রক্ত ঝরছে। খুব শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। দাঙ্গাকারীরা কারা? এরা সব হিন্দুএদের কি ক্ষতি করা হয়েছে সুলতানা তা জানে না। সুলতানা জানে না গরু নিয়ে হিন্দু মুসলমানের মাঝে ইংরেজের ডার্টি গেম খেলার কথা। হিন্দু মনে করছে গরু জবেহ হলে হিন্দুর ধর্ম থাকছে না। মুসলমান মনে করছে গরু না খেলে তার মুসলমানিত্ব কিসের। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। গরুর জীবন রক্ষার্থে অবলীলায় এখন হিন্দু মুসলমানের গলা কাটছে। মুসলমানও প্রতিশোধ নিতে পাল্টা আঘাত হানছে। দিনে দিনে হানাহানি বেড়েই চলেছে।

দাঙ্গাকারীরা উঠানে রাখা চারপায়ার উপর আব্বাজানকে শুয়ে ফেলেছে। কয়েকজনে তার হাত পা চেপে ধরে আছে। ঘাতকের ছুরি আব্বাজানের কন্ঠনালিতে বসে গেলো। লাল রক্ত ছুটে গেলো। ঘাতকের মুখে লাগলো সেই রক্ত। নিরীহ প্রতিবেশীকে বলি দিয়ে কোন স্বর্গ তুমি কামাই করছো হে নরপিশাচ। আব্বাজান কুরবানী দেয়া গরুর মত তড়পাতে লাগলো। একসময় নিথর হয়ে গেলেন। ইসমাইল হাত ছুটিয়ে ঘাতকের কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ঘাতক তার হাতের ছুরি আমূল বসিয়ে দিলো মিয়া ভাইয়ের সিনা বরাবর। সুলতানা চিৎকার দিয়ে ফেলেছিলো প্রায়। ফাতিমা মেয়ের মুখে হাত চাপা দিলো।

ঘাতকের ছুরিতে আলীও বলি হয়ে গেলো। যে বাড়িতে লাল মেহেদিতে হাত রাঙিয়ে নওশাঁর সাজে আসার কথা ছিলো সেই বাড়িতে আপন খুনে লাল হয়ে গেলো আলীর সারা শরীর। দাঁতে দাঁত চেপে গলা জলে দাঁড়িয়ে আছে ফাতিমা। সুলতানার চোখের পানি ঝরে পড়ে, জলাশয়ের পানিতে গিয়ে মেশে। রাত্রির খোলা আকাশ। মহাকাল ধরে সে নিশ্চুপ মেরে মাথার উপর বসে আছে। মুসলমান সুলতানা হিন্দুর ভয়ে পশুর মত লুকিয়ে আছে ঝোঁপের আড়ালে।

মুক্তিযুদ্ধ

এপ্রিল ১৯৭১ সালদোতলায় নিজের ঘরে বসে সুস্মিতা একটা বই পড়ছে। রবি ঠাকুরের ঘরে বাইরে । রুপসা নদীর দিক থেকে এক পশলা বাতাস ভেসে এলো। সুস্মিতা বই থেকে চোখ তুললো। দেয়ালে টাঙানো রবি ঠাকুরের প্রোট্রেটের দিকে তার নজর গেলো। সুস্মিতার মনে হলো রবি ঠাকুর তার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। রবি ঠাকুরের পাশের ছবিটা নজরুলের। যৌবনের কবি নজরুল। মাথা ভরা ঝাঁকড়া চুল নিয়ে বিদ্রোহী কবি দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন।

ঘরে বাইরে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সত্তুরের নির্বাচনে মুজিব -ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তর অথবা ভাগাভাগিতে এক মত হতে পারে নাই। ২৫ শে মার্চ রাতে  অপারেশন সার্চ লাইটের নামে পাকিস্তানিরা ঢাকায়  ঘুমন্ত বাঙালির উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সেনাবাহিনী গ্রেফতার করেছে। ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন। ১০ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমেদ মেহেরপুরের  বৈদ্যনাথতলার এক আমবাগানে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছে। ১৭ এপ্রিল এই সরকার শপথ নেয়। এই সরকারের পরিচালনায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী বাঙালি জোয়ানদের গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়ে সাহায্য করছে।

মুক্তিযুদ্ধের এই হাওয়া শান্ত নিরিবিলি শহর খুলনাতেও একরাশ উষ্ণতা ছড়িয়ে দিলো। সেনাবাহিনী আগেই পৌঁছে গেছে। পাক সেনাবাহিনীকে হঠাতে দলে দলে ছাত্র-যুবকেরা মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে।  সুস্মিতার দাদা সুব্রতও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। যশোরের বেনাপোল হয়ে  ইন্ডিয়া পৌঁছে গেছে সে।

দেশ ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে সুস্মিতার বাবা পরেশ রায় প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। ঘরবাড়ি ফেলে রেখে ভারতে যেতে তার মন সরে না। সাতচল্লিশের দাঙ্গার সময় অনেক হিন্দু ভারতে চলে। তাদেরকে কলকাতার স্থানীয় হিন্দুরা আজও রিফুজি বলে সম্বোধন করে। হোক মুসলমান প্রধান দেশ, তবু অন্যদেশে গিয়ে রিফুজি হতে পারবে না সে। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। পাক বাহিনী ক্ষেপাটে হয়ে উঠেছে। হিন্দু মুসলমান কাউকে বাদ দিচ্ছে না। যাকে সামনে পাচ্ছে পাখির মত গুলি করে মারছে। নরকের যমদূত যেন পাকিস্তানি সেনার লেবাস পরে এসেছে। বিকেলে আর ছাদে যাওয়া হয় না। ছাদে দাঁড়ালে রুপসা নদী দিয়ে প্রতিদিন লাশ ভেসে যেতে দেখা যায়।

দলে দলে লোক ইন্ডিয়া পালিয়ে যাচ্ছে।  পরেশ সিদ্ধান্ত নিলো সেও চলে যাবে। পাকসেনারা যুবতী মেয়ে পেলেই ইজ্জত নষ্ট করছে। সুস্মিতার কথা তো ভাবতে হবে। এই পাড়ার শেষ মাথায় রফিক উকিলের বাড়ি। রফিক সাহেবের ছেলেটা বিএল কলেজে পড়ত। রাজাকারেরা মুক্তি বলে সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। যতসব পাজি নচ্ছারের দল, কোন দিন নামাজ রোজা করেছে কিনা ঠিক নেই। আজ সব মাথায় টুপি দিয়ে শান্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়ে রাজাকার হয়েছে। মুখের কথা শুনলে মনে হয় একেক জন ইসলামের সেবা করতে জান প্রাণ উৎসর্গ করে দেবে। কিন্তু করে বেড়াচ্ছে দুনিয়ার আকাম। কুরআন হাদিসের কোথায় বলা হয়েছে, ধরে ধরে অন্য ধর্মের লোক মারলে ইসলাম হাছিল করা হয়। যত্তসব ভন্ডের দল।

আজ সুস্মিতারা চলে যাবে। পরেশ নৌকা ঠিক করে এসেছে। সুস্মিতার মা স্নান সেরে তুলসি তলায় গড় হয়ে প্রনাম করলো। বিয়ের পরে এই বাড়ি এসে প্রতি সন্ধ্যায় তুলসি তলায় প্রদ্বীপ জ্বালিয়েছে সুস্মিতার মা। আজকের পর থেকে তুলসি তলায় আর বাতি জ্বলবে না।

পরেশ বারবার তাড়া দিতে লাগলো। জলদি করো। দেরি হলে রাস্তায় মিলিটারি নেমে যাবে। যদিও রাস্তায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ির পেছনের বাগান ধরে রুপসা পাড়ে চলে যাওয়া যায়।

ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা দেবে এই সময়ে সদর দরজায় আর্মি এসে হাজি। পাকিস্তানী আর্মির সাথে এক বাঙালি ছোকড়া। মাথায় টুপি, কাঁধে রাইফেল। পরেশদের দিকে আঙুল তুলে বললো, “দেখেন হুজুর, মালাউনের বাচ্চার কান্ড দেখেন। সোনা দানা গহনা নিয়ে ইন্ডিয়া ভাগতিছে

পাক সেনারা ছোকড়ার বাংলা কি বুঝলো কে জানে। পরেশ বাবুর ছেলে যে মুক্তিতে যোগ দিয়েছে এখবর তারা পেয়ে গেছে। চিকনা করে এক সেনা রাইফেল তুলে গুলি করলো। পরেশ বাবু বুক চেপে বসে পড়লেন। অস্ফুটে বললেন, ‘ মা সুস্মিতা পালাতারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।



হতবিহ্বলতা কাটতেই সুস্মিতা বাগানের দিকে ছুটতে শুরু করলো। তার পিছে পিছে ছুটছে দুই পাঠান যুবক। শারীরিকভাবে পাঠান যুবক খুবই সুদর্শন হয়। কিন্তু নিরীহ এক কিশোরীকে পশুর মত তাড়া করা এই দুই যুবককে আজ পিশাচের মত লাগছে। গাছের শিকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো সুস্মিতা। সৈনিকেরা তার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বাড়ির উঠানে নিয়ে এলো। পরেশ বাবু শিড়ির উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। চাপচাপ রক্ত জমাট বেঁধে আছে। সুস্মিতার মায়ের লাশ পাওয়া গেলো দরজার পাশে। বড়বড় চোখ করে তিনি তাকিয়ে আছেন। সে চোখে ভয় নাকি বিস্ময়!

পরেশ বাবু বলতেন, বাল্যবিবাহ এই অঞ্চলের বড় সমস্যা। অল্প বয়সে মা হতে গিয়ে অহরহ মেয়ে মারা যাচ্ছে। আমার মেয়ের বয়স কুড়ি না পেরোলে বিয়ে দেবো না। পাক সেনারা টানতে টানতে সুস্মিতাকে দোতলার ঘরে নিয়ে গেলো। এক এক করে সেনারা আসতে লাগলো। দশজন পাকির পরে রাজাকারের বাচ্চাটাও তার পালা মিটিয়ে গেলো।

দেয়ালে টাঙানো রবীন্দ্রনাথ। তাকিয়ে আছেন। রবি ঠাকুরের দৃষ্টিতে কি বিস্ময় ! বিদ্রোহী কবি দরজার দিকে  তাকিয়ে আছেন। সে চোখে কি ঘৃণার আগুন? হিন্দু সুস্মিতা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে তার চিরচেনা বিছানায় অচেনা এক শরীর নিয়ে।


কতশতাব্দী পেরিয়ে যায়। কাল গিয়ে মেশে মহাকালে । মানবধর্ম নিয়ে কত শত আলোচনা হয়। মানুষকি বদলায়। কিন্তু পৃথিবীর কোন ধর্ম শাস্ত্রই কি বলে, মানুষকে ঘৃণা করো?
লাইক এন্ড শেয়ারঃ :
 

+ টি মন্তব্য + 2 টি মন্তব্য

শিখর রায়
June 7, 2014 at 8:51 AM

চমৎকার গল্প। গল্পের সাথে অনেক কিছু জানলাম দাদা। আরো লিখুন।

সবুজ আমার নাম
June 7, 2014 at 8:53 AM

ভাই মনে করো না হাওয়া দিচ্ছি। তোমার লেখা পড়লে আমার মনে হয় বিখ্যাত কারো লেখা পড়ছি। অওসাম। পরের গল্পের অপেক্ষায় রইলাম।

Post a Comment

 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।