Rainy day at Village

Rainy season is just knocking my door. Rainy season is the second season of bangla year. Here i disclose some photos of rainy day at my village located near sundarban.


Photo: 1  A baby girl sitting on varanda of a village house and watching the rain drops falling from the room of the house. Look at her expression, she really enjoying it. Rain has power to make us childish like the baby.



Photo:2 A muddy village road after rain. Look at those boys. what they did? what do you think? ha ha ha.This picture is taken from a village name Bhagbah, located near sundarban, the world famous mangrove forest.



photo: 3 A rainbow arises after rain over the river poshur near chalna launch ghat. Poshur river is directly connected with Bay of bengal.



photo: 4 Clouds over Shibsha river. Shibsha is one of the largest river of khulna district situated on the arms of sundarban.



Photo: 5 Raining over a village pond at bhagbah. The ponds overflows the banks.



Photo: 6 Its raining. Raning scene from a village hut. Women collects Rain water for drinking purpose. The peoples of southern part of bangladesh still collects drinking water from rain source.



photo: 7 A sunset scene at a rainy evening. Location: western field of village bhagbah.



photo: 8 Man on the top of a launch named MV Mohammadi. MV Mohammadi gives transport facility between khulna town with its southern sub districts named Dacope and koyra. 


Photo: 9 Workers whom are work in paddy field cover themselves with polythene to protect rain. They called it jumur. They use jumur when work in field.



Photo: 10 The yard of my village hosue. 

All photos is taken by Nokia 3120c mobile phone. It will be my pleasure if you like my Photography.

 

বর্তমান সময়ের বিখ্যাত ফুটবলার এবং তাদের উত্তমার্ধগণ (ভাবী)

ব্রাজিল
 
Neymar – Brazil
আর্জেন্টিনা
 
Messi – Argentina 
ষ্পেইন
 
Iniesta – Spain
পর্তুগাল
 
Ronaldo – Portugal
ইংল্যান্ড
 
Rooney – England
জার্মানী

Ozil – Germany
ইটালী

Balotelli – Italy
ফ্রান্স

Ribery - Franch
নেদারল্যান্ড

Robben – Netherlands
আলজেরিয়া

Bentaleb – Algeria
 

চলার পথে একমুঠো স্মৃতি ফেলে

আর দশটি দিনের মত 
বাড়ির পথ ধরেছিলাম
দীর্ঘ দুই মাস পরে
ছুটেছি বাড়ির তরে
মনে মাঝে খুশীর ঢেউ
বুঝতে পারবে যে কেউ।

ট্রেন ছাড়লো কমলাপুর
রাত তখনো হয়নি দুপুর
দুই সিট সামনে ছিলে তুমি
অপলকে চেয়ে ছিলেম আমি
ও চোখে ছিলো কি যাদু
মাছিকে যেমনি টানে মধু।

সারাটি পথ হলো বহু চোখাচোখি
কাছে যাওয়া আর হলো না
অবশেষে রেল থামলো নওয়াপাড়া
তুমি হয়ে গেলে সারা,
যে যার গন্তব্যে গেছি চলে
চলার পথে একমুঠো স্মৃতি ফেলে।


 

দোরোখা একাদশী

উড়িয়ে লুচি আড়াই দিস্তে দেড় কুড়ি আম সহ
একাদশীর বিধান-দাতা করেন একাদশী,
মুখরোচক এঁর উপবাস,— দমেও ভারী,—অহো!—
পুণ্য ততই বাড়ে যতই এলান্ ভুঁড়ির কশি!
ওদিকে ওই ক্ষীণ মেয়েটি নিত্য একাহারী
একাদশীর বিধান পালন কর্‌ছে প্রাণে ম’রে,
কণ্ঠাতে প্রাণ ধুঁক্‌ছে, চোখে সর্ষে-ফুলের সারি,
তৃষ্ণাতে জিভ্ অসাড়্, মালা জপ্‌ছে ঠাকুর-ঘরে।
অবাক্ চোখে বিশ্ব দ্যাখে হায় গো বিশ্বনাথ,
দোরোখা এই বিধান ’পরে হয় না বজ্রপাত?


* *

নিষ্ঠাবানের সধবাও করেন একাদশী
পতির পাতে প্রচুর ভাবে ‘আট্‌কে’ বেঁধে রেখে,
আওটা-দুখে চুমুক লাগান্ পিছন ফিরে বসি’
পাঁতিদাতা পতি-গুরু পাছে ফেলেন দেখে।
বিড়াল চাটে দুধের বাটি বাড়িয়ে দিয়ে গলা,
পিঁপ্‌ড়ে মাছি আমের খোলায় উল্লাসে ভিড় করে,
শাস্ত্র যাদের ভয় দেখিয়ে করিয়েছে নির্জ্জলা
তারাই শুধু হাতের চেটো মেল্‌ছে মেঝের পরে।
তৃষ্ণাতে জিভ্ টান্‌ছে পেটে, এম্‌নি রোদের তাত্,
খস্‌খসে দুই চোখের পাতা, হয় না অশ্রুপাত।


* *

ফোঁটায় ফোঁটায় শিবের মাথায় ঝারার যে জল ঝরে—
সতৃষ্ণ চোখ সারা বেলা দেখ্‌ছে শুধু তাই,
কাকটা কখন গুটি গুটি ঢুকে ঠাকুর-ঘরে
অর্ঘ্যপাত্রে মুখ দে’ গেল,—একটুও হুঁশ নাই!
চক্ষু দিয়ে প্রাণ-পাখী হায় মেল্‌ছে বুঝি পাখা,
ভির্ম্মি গেছে—ভির্ম্মি গেছে—জল কে দেবে মুখে?
কারো সাড়া নেইকো কোথাও মিথ্যে হাঁকা ডাকা—
একাদশীর বিধান-দাতার গর্জ্জে নাসা সুখে।
অধোমুখে বিশ্ব দ্যাখে, হায় গো বিশ্বনাথ।
পাষাণ ’পরে অশ্রু ঝরে’ পড়ে দিবসরাত।
 

জিপসি-শাকিরা (অনুবাদ)

শাকিরার জিপসি গানটি আমাকে অন্যরকমভাবে টানে। গানটিতে চমৎকারভাবে মেটাফোর ব্যবহার করা হয়েছে। সর্বোপরি গানটির মিউজিক ভিডিও অওসাম । যে কথা না বললেই নয়, গানটির কয়েকটি লাইন আমি নিজের মত করে অনুবাদ করে নিয়েছি।

শাকিরা- জিপসি
আমার করা অনুবাদ

চলার পথে আমার হৃদয় ভেঙে
সপ্তাহ শেষে সব কিছু পেছনে ফেলে
বন্ধু এবং চিন্তাগুলো আমাকে এড়িয়ে গেছে      
হাঁটাহাটি খুবই বিরক্তিকর হয়ে যাবে যখন তুমি উড়তে শিখবে                          
আমি ঘরে ফেরা ধরনের নই                          
শীর্ষে উঠে দেখ  এবং কে জানে তুমি কি খুঁজে পাবে                          
আমার সকল পাপের কথা স্বীকার করতে চাই না                          
তুমি বেট করতে পারো আমি এটার চেষ্টা করবো , কিন্তু তুমি সর্বদা সফল হতে পারবে না                          
কারণ আমি একজন ভবঘুরে , তুমি কি আমার সাথে আসছো?                            
 আমি হয়তো তোমার পোষাক চুরি করবো এবং গায়ে লাগলে পরবো                            
আমিও কোন চুক্তি করিনি ঠিক একজন ভবঘুরের মত                            
এবং আমি পিছনে ফিরে যেতে পারিনা , কারণ জীবন আমাকে সর্বদা তাড়া করে                            
এবং আমি কাঁদবো না্‌ , আমার এখনও মরার বয়স হয়নি যদি তুমি আমাকে মারতে চাও                            
কারণ আমি একজন ভবঘুরে , কারণ আমি একজন ভবঘুরে                            
আমি লুকোতে পারিনা,  যা আমি করেছি                            
ক্ষতচিহ্ন আমাকে মনে করিয়ে দেবে , যত দূরেই যাই না কেন                            
তাকে , যাকে জানানো দরকার                            
শুধু কাঁচি নিয়ে ছোটো,  যখন তুমি আঘাত পেতে চাও                          
কারণ আমি একজন ভবঘুরে  তুমি কি আমার সাথে আসছো?                          
আমি হয়তো তোমার পোষাক চুরি করবো এবং গায়ে লাগলে পরবো                          
আমিও কোন চুক্তি করিনা ঠিক একজন ভবঘুরের মত                          
এবং আমি পিছনে ফিরে যেতে পারিনা ,কারণ জীবন আমাকে সর্বদা তাড়া করে                          
আমি কাঁদবো না , আমার এখনও মরার বয়স হয়নি যদি তুমি আমাকে মারতে চাও                          
কারণ আমি একজন ভবঘুরে                          
এবং আমি বলি,  এই যে তুমি  তুমি কোন বোকা নও                            
যদি তুমি না বলো , এভাবেই কি জীবন কেটে যাচ্ছে না                            
মানুষ ভয় করে যা সে জানেনা                          
এবং আমি বলি, এই যে তুমি  তুমি কোন বোকা নও                          
যদি তুমি না বল,  এভাবেই কি জীবন কেটে যাচ্ছে না                          
মানুষ ভয় করে যা সে জানেনা                          
আমার সাথে চল,  ওহ,  হ্যাঁ                          
আমার সাথে চলো                          
কারণ আমি একজন ভবঘুরে  তুমি কি আমার সাথে আসছো?                          
আমি হয়তো তোমার পোষাক চুরি করবো এবং গায়ে লাগলে পরবো                          
আমিও কোন চুক্তি করিনি ঠিক একজন ভবঘুরের মত                            
এবং আমি পিছনে ফিরে যেতে পারিনা কারণ জীবন আমাকে সর্বদা তাড়া করে                          
এবং আমি কাঁদবো না,  আমার এখনও মরার বয়স হয়নি যদি তুমি আমাকে মারতে চাও                          
কারণ আমি একজন ভবঘুরে                        



 

মহাকাল (ত্রয়ী গল্প)

বিশ্বযুদ্ধ
সবুজ ঘাসের মাঠ পেরিয়ে ছুটে চলেছে সুশান্না। সুশান্না হুদাস। চির পরিচিত গাছগুলো পেছনে পড়ে যাচ্ছে। কোন দিকে ভ্রুক্ষেপ নেই তার। গুলির বেগে ছুটে চলেছে সে। দূরে কোথাও গুলির আওয়াজ শোনা গেলো। শব্দ শুনে একটা পাখি ডানা ঝাপটে উড়াল দিলো আকাশে।

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ চলছে। মিত্র বাহিনীর সাথে অক্ষ বাহিনীর প্রচন্ড যুদ্ধ চলছে। সম্মুখসমরে জার্মান বাহিনীর হাতে পোলিশ বাহিনী পর্যুদস্ত প্রায়। সুশান্নাদের গ্রামের নাম জিয়েলোনা গোরা। পোলিশ ভাষার এই শব্দের অর্থ সবুজ উপত্যকা। এলাকাটা নামকরণের স্বার্থকতা বহন করছে। সবুজ ঘাসের চাদরে আবৃত পুরো উপত্যকা। সাদা কাটা ছোপ আঁকা গরুগুলো আপন মনে ঘাসে মুখ ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। জিয়োলোনা গোরা গ্রামের অধিকাংশ মানুষ কৃষক। দুগ্ধ খামার, ফসল চাষ করে প্রতিটি পরিবার সুখে আছে সেটা বাড়ি ঘরের চেহারা দেখলেই বোঝা যায়। সুশান্নাদেরও বেশ বড় খামার আছে। সুশান্নার বড় ভাই জ্যাকব আর্মিতে চাকরি করে। করতেন। গত সপ্তাহে খবর এসেছে জ্যাকব যুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। সুশান্নার বাবা সলোমন হুদাস পরিবারের বড় সন্তান যুদ্ধে যাক এটা কিছুতেই মানতে চায় নাই। তাদের যে জোতজমি আছে, গরুর খামার আছে তাতে একটা ছেলের দিব্যি চলে যাবে। চাকরি করতে যাওয়ার দরকার কি আছে! কিছু জ্যাকব, সুশান্নার বড় ভাই কারো কোন কথাই শুনলো না। জ্যাকব সেনাবাহিনীতে গেছে দুই শীত আগে। এই গ্রীষ্মে জ্যাকবের বাড়ি আসার কথা ছিলো। তার আগেই শুরু হলো পোড়ার যুদ্ধ। গ্রীষ্ম এলো কিন্তু জ্যাকব এলো না। এলো তার মৃত্যু সংবাদ।

সুশান্নাদের গ্রামে যুদ্ধ হয়ে গেছে। দিন রাত সারাক্ষণ মেশিন গানের ঠাঠা শব্দে কানে তালা লাগার যোগাড়। সলোমন সবাইকে নিয়ে গোলাঘরে লুকিয়ে রইলো। তাদের বাড়ির ধারে কাছে যুদ্ধ হয় নাই। কিন্তু কোথা থেকে অনবরত গুলি ছুটে আসতে লাগলো। দেয়ালের গাঁয়ে ঠুসঠাস করে বিঁধতে লাগলো। গুলি খেয়ে খামারের অর্ধেক গরু মরে গেলো। পোলিশেরা পিছু হটে চলে গেছে। পুরো এলাকা এখন জার্মান সৈন্যদের দখলে। খুঁজে খুঁজে ইহুদি বাড়ি গুলোতে হাজির হচ্ছে। পাখির মত গুলি করে মারছে। সুশান্না জানে না খ্রিষ্টান জার্মানদের কেন এই ইহুদি বিদ্বেষ। পোলিশ ইহুদিরা জার্মান খ্রিস্টানদের কি ক্ষতি করেছে? সলোমন হুদাস অবশেষে সিদ্ধান্ত নিলো পরিবার নিয়ে পালিয়ে যাবে। রাজধানী এখনো পোলিশদের দখলে আছে। সেদিকেই যাওয়া যাক। তারপর যা হবার হবে। নিঃশব্দে ব্যাগ পত্তর গোছাচ্ছে ওলগা। বাড়িটা পোড়া বাড়ির মত খাঁ খাঁ করছে। বাইরে থেকে বোঝার উপায় নেই ভেতরে কেউ আছে। এমন সময় গাড়ীর চাকার শব্দ পাওয়া গেলো। জানালা দিয়ে দেখা গেলো সবুজ ঘাসের বুক চিরে যে রাস্তা, সেই রাস্তায় হলুদ ধুলো উড়িয়ে ছুটে আসছে একটি আর্মি জিপ। তাদের দরজার সামনে এসেই থামলো। সলোমনের গলা শুকিয়ে গেলো। কিছু বুঝে ওঠার আগে দরজায় টোকা পড়লো। সুশান্নার মা ওলগা সুশান্নাকে রান্নাঘরের পেছনের দরজা দিয়ে বের করে দিলো। বলে দিলো, ‘মা আমাদের যাই হোক তুমি যেভাবেই পারো নিজেকে রক্ষা করোপেছনের দরজাটা ঠিক দরজা নয়। মেঝে দিয়ে একটা সূড়ঙ্গ পথের মত। ছোটবেলায় সুশান্নারা এই পথ দিয়ে চোর পুলিশ খেলতো। সুশান্না সুড়ঙ্গ দিয়ে বের হতেই গুলির শব্দ শোনা গেলো। আর সেই সাথে কেউ কাঠের মেঝেতে পড়ার শব্দ হলো। সুশান্নার মা হেলেনার আর্তচিৎকার শোনা গেলো। পরমূহূর্তেই সেটা থেমে গেলো। সুনশান নিস্তব্ধতা। কাঠের মেঝেতে আর্মি বুটের মচমচ শব্দ। সুশান্না সুড়ঙ্গ বেয়ে বাড়ির পেছনের অংশে বেরিয়ে এলো। মুহূর্তকাল সে হতবিহ্বল হয়ে রইলো। কি করা উচিত তার! বাবা মার কাছে ফিরে যাবে! আকাশের দিকে মুখ তুলে চাইলো। গ্রীষ্ম সকালের আকাশে সাদা সাদা তুলোর মত মেঘ। সুশান্না কিছু না ভেবেই ছোটা শুরু করলো। সবুজ ঘাসের মাঠ পেছনে ছুটতে শুরু করছে। সুশান্না ছুটছে। ইহুদি সুশান্না।

অধর্মযুদ্ধ
১৯৪৭ সাল। অস্থির এক আগুনে পুড়ছে সমগ্র ভারতবর্ষ। করাচি, লাহোর, দিল্লী , কলকাতা , ঢাকাকোন বড় শহরই বাদ পড়েনি । সেই আগুনের হলকা এসে লেগেছে সুলতানাদের বাড়িতে। সুলতানাদের গ্রামের নাম ভূবনপাল্লি। খ্রিষ্টীয় ১০ শতকের এক শাসক চালুক্য ত্রৈলক্য মাল্লা ভূবনেশ্বরার নামে এই গ্রামের নামকরণ করা হয়। বহু শতাব্দী প্রাচীন এই গ্রামের অধিকাংশ অধিবাসী হিন্দু। কিছু মুসলমান, শিখ, জৈনও আছে। ভারতের অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্যের সেকেন্দারাবাদের এই গ্রামে সকল ধর্মের সকল মতের মানুষ মিলে মিশেই বাস করে এসেছে এতদিন। কিন্তু খ্রিষ্টান ব্রিটিশের ডিভাইড রুলে আজ হিন্দু মুসলমান পুরো দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে গেছে।

শাওয়াল মাসে সুলতানার বিয়ে। কিশোরী সুলতানার চোখে এখন রঙিন স্বপ্ন। যার সাথে সুলতানার সাদি ঠিক হয়েছে তাকে সে চেনে। সুলতানা যখন বোরখায় শরীর ঢেকে সহেলিদের সাথে মাদ্রাসায় যায় তখন গলির মুখে ইয়ার দোস্তদের নিয়ে সুদর্শন এই যুবককে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেছে সে। আলীর উচ্চতা ছ ফুটের কাছাকাছি। সবুজ রঙের পাঞ্জাবীতে মানিয়েছে বেশ। ঘন কালো বাবরি চুল কানের পাশে নেমে এসেছে। গায়ের রং উজ্জ্বল শ্যামলা। সুলতানা নিজে ধবধবে ফর্সা। উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণ সুলতানার খুব পছন্দ।

নেকাবে ঢাকা সুলতানার পুরো মুখ। শুধু পটলচেরা চোখ দুটি দেখা যায়। চকিতে সেই চোখে চোখাচোখি হয়ে গেল। সুলতানা দ্রুত চোখ নামিয়ে নিলো। আরো কয়েকবার আলীকে দেখা গেলো গলির মুখে। আলীর বাড়ি পাশের গ্রামে। তিরুমালাগিরি। তিরুমালাগিরি, ভূবনপাল্লি এবং আলওয়াল এই তিনটি বড় গ্রাম নিয়ে সেকেন্দ্রাবাদ গঠিত। সপ্তাহ না পেরোতেই আলীর মুরুব্বীরা আব্বাজানের কাছে বিবাহের পয়গাম নিয়ে এলো। আব্বাজান, মিয়াভাই ইসমাইল সবাই রাজি। শাওয়াল মাসের শেষ জুমা শাদির দিন ঠিক করা হয়েছে। সুলতানার সেহেলিরা নিকাহের বিভিন্ন কথা বার্তা বলে অস্থির করে তুলেছে।

এরই মধ্যে দেশজুড়ে শুরু হয়েছে অস্থিরতা। আব্বাজান বলছেন, মুসলমানদের জন্য পাকিস্তান বলে আলাদা একটা দেশ তৈরী করা হচ্ছে। হিন্দুস্তানের সব মুসলমানদের সেখানে চলে যেতে হবে। লাহোর করাচির ওদিকে। আম্মিজান ফাতিমা শুনে আঁতকে ওঠেন। এই ঘরবাড়ি ছেড়ে কোথায় যাবেন! সেই অজানা অচেনা পাকিস্তান কিভাবে আমাদের দেশ হবে! সুলতানাও ভাবে। অনেক অনেক ভাবে। এই চিরচেনা বাড়ি , ওই খোলা আকাশ সব ছেড়ে সে কিভাবে যাবে! আচ্ছা, সেই পাকিস্তানের আকাশ কি এই হায়দ্রাবাদের আকাশের মত সুন্দর। সেখানকার আকাশেও কি মেঘেরা পেখম মেলে বাদল দিনে নৃত্য করে। ওখানকার মানুষেরাও কি হায়দ্রাবাদের মত তেলেগুভাষী। সুলতানা তেলেগু ছাড়া হিন্দী উর্দু বুঝতে পারে না। সে খুব পেরেশানী বোধ করে।

খুন এখন নিত্য নৈমিত্তিক ব্যাপার। প্রতিদিন কোন না কোন বাড়ি খুন হচ্ছে। হিন্দু মুসলমান একে অন্যকে ধর্মরক্ষার নামে খুন করছে। একজন চাকু বসাচ্ছে তো অন্যজন গলা কাটছে। আজ খুব কাছেই চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে। আব্বাজান বললেন, “না আর থাকা যাবেনা। ফাতিমা, সুলতানা তোমরা গুছিয়ে নাও

দরজায় জোরে ধাক্কানোর শব্দ শোনা গেলো। ঘরের সবাই আঁতকে উঠলো। আব্বাজান কম্পিত স্বরে জিজ্ঞেস করলেন , “কে?”

'আমি আলী।আলীর গলা শোনা গেলো।

আব্বাজান দরজা খুলে আলীকে ঘরে ঢোকালেন। ইসমাইল জিজ্ঞেস করলেন, ‘কি ব্যাপার আলী, পরিস্থিতি খারাপ, এর মধ্যে তুমি বাইরে কেন?’

আলী সংকোচ বোধ করে। সে কেন ছুটে এসেছে জানে না। 'শুনলাম আপনাদের এদিকে হিঁদুরা আক্রমন করেছে। খুব পেরেশানি লাগছিলো। থাকতে না পেরে ছুটে চলে এলাম।'

আব্বাজান বললেন, ‘ এই অবস্থায় বাইরে বের হওয়া তোমার মোটেও উচিত হয়নি

ফাতিমা মেয়েকে বুকে চেপে ধরে। বিয়ের আগেই জামাই তার মেয়েকে এত ভালবাসে। মেয়ে তার রানীর হালে জীবন কাটাবে ফাতিমা এ যে দিব্য দৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছে। ফাতিমার চোখ থেকে টপটপ করে পানি ঝরে পড়তে লাগলো।

আলী কিছু আগে চলে এসেছে। দাঙ্গাকারীরা তার পরে এসে পৌছায়। সুলতানাদের মজবুত দরজা ভেঙ্গে ফেলতে সমর্থ হয়েছে। হুড়োহুড়ির ভিতরে ফাতিমা কিভাবে যে সুলতানাকে নিয়ে বেরিয়ে এসেছে বলতে পারবে না। কোথায় যাবে সে? বাড়ির পাশের জলাধারে নেমে যায় সে। সুলতানা মায়ের হাত ধরে নেমে যায়। জলাধারের এক পাশে পানির উপর ঝোপের মত হয়ে আছে। ফাতিমা মেয়েকে নিয়ে সেই ঝোপের আড়ালে আশ্রয় নিলো।

আব্বাজান, ইসমাইল, আলীকে দাঙ্গাকারীরা ধরে ফেলেছে। তাদের হাত পিঠমোড়া দিয়ে বাঁধা। আলীর চোয়ালের একপাশ দিয়ে রক্ত ঝরছে। খুব শক্ত কিছু দিয়ে আঘাত করা হয়েছে। দাঙ্গাকারীরা কারা? এরা সব হিন্দুএদের কি ক্ষতি করা হয়েছে সুলতানা তা জানে না। সুলতানা জানে না গরু নিয়ে হিন্দু মুসলমানের মাঝে ইংরেজের ডার্টি গেম খেলার কথা। হিন্দু মনে করছে গরু জবেহ হলে হিন্দুর ধর্ম থাকছে না। মুসলমান মনে করছে গরু না খেলে তার মুসলমানিত্ব কিসের। কেউ কাউকে ছাড় দিচ্ছে না। গরুর জীবন রক্ষার্থে অবলীলায় এখন হিন্দু মুসলমানের গলা কাটছে। মুসলমানও প্রতিশোধ নিতে পাল্টা আঘাত হানছে। দিনে দিনে হানাহানি বেড়েই চলেছে।

দাঙ্গাকারীরা উঠানে রাখা চারপায়ার উপর আব্বাজানকে শুয়ে ফেলেছে। কয়েকজনে তার হাত পা চেপে ধরে আছে। ঘাতকের ছুরি আব্বাজানের কন্ঠনালিতে বসে গেলো। লাল রক্ত ছুটে গেলো। ঘাতকের মুখে লাগলো সেই রক্ত। নিরীহ প্রতিবেশীকে বলি দিয়ে কোন স্বর্গ তুমি কামাই করছো হে নরপিশাচ। আব্বাজান কুরবানী দেয়া গরুর মত তড়পাতে লাগলো। একসময় নিথর হয়ে গেলেন। ইসমাইল হাত ছুটিয়ে ঘাতকের কাঁধে ঝাঁপিয়ে পড়লেন। ঘাতক তার হাতের ছুরি আমূল বসিয়ে দিলো মিয়া ভাইয়ের সিনা বরাবর। সুলতানা চিৎকার দিয়ে ফেলেছিলো প্রায়। ফাতিমা মেয়ের মুখে হাত চাপা দিলো।

ঘাতকের ছুরিতে আলীও বলি হয়ে গেলো। যে বাড়িতে লাল মেহেদিতে হাত রাঙিয়ে নওশাঁর সাজে আসার কথা ছিলো সেই বাড়িতে আপন খুনে লাল হয়ে গেলো আলীর সারা শরীর। দাঁতে দাঁত চেপে গলা জলে দাঁড়িয়ে আছে ফাতিমা। সুলতানার চোখের পানি ঝরে পড়ে, জলাশয়ের পানিতে গিয়ে মেশে। রাত্রির খোলা আকাশ। মহাকাল ধরে সে নিশ্চুপ মেরে মাথার উপর বসে আছে। মুসলমান সুলতানা হিন্দুর ভয়ে পশুর মত লুকিয়ে আছে ঝোঁপের আড়ালে।

মুক্তিযুদ্ধ

এপ্রিল ১৯৭১ সালদোতলায় নিজের ঘরে বসে সুস্মিতা একটা বই পড়ছে। রবি ঠাকুরের ঘরে বাইরে । রুপসা নদীর দিক থেকে এক পশলা বাতাস ভেসে এলো। সুস্মিতা বই থেকে চোখ তুললো। দেয়ালে টাঙানো রবি ঠাকুরের প্রোট্রেটের দিকে তার নজর গেলো। সুস্মিতার মনে হলো রবি ঠাকুর তার দিকে হাসি হাসি মুখে তাকিয়ে আছেন। রবি ঠাকুরের পাশের ছবিটা নজরুলের। যৌবনের কবি নজরুল। মাথা ভরা ঝাঁকড়া চুল নিয়ে বিদ্রোহী কবি দরজার দিকে তাকিয়ে আছেন।

ঘরে বাইরে পরিস্থিতি খুবই খারাপ। সত্তুরের নির্বাচনে মুজিব -ইয়াহিয়া ক্ষমতা হস্তান্তর অথবা ভাগাভাগিতে এক মত হতে পারে নাই। ২৫ শে মার্চ রাতে  অপারেশন সার্চ লাইটের নামে পাকিস্তানিরা ঢাকায়  ঘুমন্ত বাঙালির উপর নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করেছে। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে সেনাবাহিনী গ্রেফতার করেছে। ২৭ মার্চ মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেছেন। ১০ এপ্রিল তাজউদ্দিন আহমেদ মেহেরপুরের  বৈদ্যনাথতলার এক আমবাগানে বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি করে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠন করেছে। ১৭ এপ্রিল এই সরকার শপথ নেয়। এই সরকারের পরিচালনায় বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হয়েছে। যুদ্ধে ভারতীয় বাহিনী বাঙালি জোয়ানদের গেরিলা যুদ্ধের ট্রেনিং দিয়ে সাহায্য করছে।

মুক্তিযুদ্ধের এই হাওয়া শান্ত নিরিবিলি শহর খুলনাতেও একরাশ উষ্ণতা ছড়িয়ে দিলো। সেনাবাহিনী আগেই পৌঁছে গেছে। পাক সেনাবাহিনীকে হঠাতে দলে দলে ছাত্র-যুবকেরা মুক্তি বাহিনীতে যোগ দিচ্ছে।  সুস্মিতার দাদা সুব্রতও যুদ্ধে যোগ দিয়েছে। যশোরের বেনাপোল হয়ে  ইন্ডিয়া পৌঁছে গেছে সে।

দেশ ছেড়ে যাওয়ার ব্যাপারে সুস্মিতার বাবা পরেশ রায় প্রথম দিকে সিদ্ধান্ত নিতে পারছিলো না। ঘরবাড়ি ফেলে রেখে ভারতে যেতে তার মন সরে না। সাতচল্লিশের দাঙ্গার সময় অনেক হিন্দু ভারতে চলে। তাদেরকে কলকাতার স্থানীয় হিন্দুরা আজও রিফুজি বলে সম্বোধন করে। হোক মুসলমান প্রধান দেশ, তবু অন্যদেশে গিয়ে রিফুজি হতে পারবে না সে। কিন্তু পরিস্থিতি ক্রমেই ঘোলাটে হয়ে যাচ্ছে। পাক বাহিনী ক্ষেপাটে হয়ে উঠেছে। হিন্দু মুসলমান কাউকে বাদ দিচ্ছে না। যাকে সামনে পাচ্ছে পাখির মত গুলি করে মারছে। নরকের যমদূত যেন পাকিস্তানি সেনার লেবাস পরে এসেছে। বিকেলে আর ছাদে যাওয়া হয় না। ছাদে দাঁড়ালে রুপসা নদী দিয়ে প্রতিদিন লাশ ভেসে যেতে দেখা যায়।

দলে দলে লোক ইন্ডিয়া পালিয়ে যাচ্ছে।  পরেশ সিদ্ধান্ত নিলো সেও চলে যাবে। পাকসেনারা যুবতী মেয়ে পেলেই ইজ্জত নষ্ট করছে। সুস্মিতার কথা তো ভাবতে হবে। এই পাড়ার শেষ মাথায় রফিক উকিলের বাড়ি। রফিক সাহেবের ছেলেটা বিএল কলেজে পড়ত। রাজাকারেরা মুক্তি বলে সেনাবাহিনীর হাতে ধরিয়ে দিয়েছে। যতসব পাজি নচ্ছারের দল, কোন দিন নামাজ রোজা করেছে কিনা ঠিক নেই। আজ সব মাথায় টুপি দিয়ে শান্তিবাহিনীতে নাম লিখিয়ে রাজাকার হয়েছে। মুখের কথা শুনলে মনে হয় একেক জন ইসলামের সেবা করতে জান প্রাণ উৎসর্গ করে দেবে। কিন্তু করে বেড়াচ্ছে দুনিয়ার আকাম। কুরআন হাদিসের কোথায় বলা হয়েছে, ধরে ধরে অন্য ধর্মের লোক মারলে ইসলাম হাছিল করা হয়। যত্তসব ভন্ডের দল।

আজ সুস্মিতারা চলে যাবে। পরেশ নৌকা ঠিক করে এসেছে। সুস্মিতার মা স্নান সেরে তুলসি তলায় গড় হয়ে প্রনাম করলো। বিয়ের পরে এই বাড়ি এসে প্রতি সন্ধ্যায় তুলসি তলায় প্রদ্বীপ জ্বালিয়েছে সুস্মিতার মা। আজকের পর থেকে তুলসি তলায় আর বাতি জ্বলবে না।

পরেশ বারবার তাড়া দিতে লাগলো। জলদি করো। দেরি হলে রাস্তায় মিলিটারি নেমে যাবে। যদিও রাস্তায় যাওয়ার প্রয়োজন নেই। বাড়ির পেছনের বাগান ধরে রুপসা পাড়ে চলে যাওয়া যায়।

ঘর থেকে বেরিয়ে দরজায় তালা দেবে এই সময়ে সদর দরজায় আর্মি এসে হাজি। পাকিস্তানী আর্মির সাথে এক বাঙালি ছোকড়া। মাথায় টুপি, কাঁধে রাইফেল। পরেশদের দিকে আঙুল তুলে বললো, “দেখেন হুজুর, মালাউনের বাচ্চার কান্ড দেখেন। সোনা দানা গহনা নিয়ে ইন্ডিয়া ভাগতিছে

পাক সেনারা ছোকড়ার বাংলা কি বুঝলো কে জানে। পরেশ বাবুর ছেলে যে মুক্তিতে যোগ দিয়েছে এখবর তারা পেয়ে গেছে। চিকনা করে এক সেনা রাইফেল তুলে গুলি করলো। পরেশ বাবু বুক চেপে বসে পড়লেন। অস্ফুটে বললেন, ‘ মা সুস্মিতা পালাতারপর মাটিতে লুটিয়ে পড়লেন।



হতবিহ্বলতা কাটতেই সুস্মিতা বাগানের দিকে ছুটতে শুরু করলো। তার পিছে পিছে ছুটছে দুই পাঠান যুবক। শারীরিকভাবে পাঠান যুবক খুবই সুদর্শন হয়। কিন্তু নিরীহ এক কিশোরীকে পশুর মত তাড়া করা এই দুই যুবককে আজ পিশাচের মত লাগছে। গাছের শিকড়ে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলো সুস্মিতা। সৈনিকেরা তার চুলের মুঠি ধরে টানতে টানতে বাড়ির উঠানে নিয়ে এলো। পরেশ বাবু শিড়ির উপর উপুড় হয়ে পড়ে আছেন। চাপচাপ রক্ত জমাট বেঁধে আছে। সুস্মিতার মায়ের লাশ পাওয়া গেলো দরজার পাশে। বড়বড় চোখ করে তিনি তাকিয়ে আছেন। সে চোখে ভয় নাকি বিস্ময়!

পরেশ বাবু বলতেন, বাল্যবিবাহ এই অঞ্চলের বড় সমস্যা। অল্প বয়সে মা হতে গিয়ে অহরহ মেয়ে মারা যাচ্ছে। আমার মেয়ের বয়স কুড়ি না পেরোলে বিয়ে দেবো না। পাক সেনারা টানতে টানতে সুস্মিতাকে দোতলার ঘরে নিয়ে গেলো। এক এক করে সেনারা আসতে লাগলো। দশজন পাকির পরে রাজাকারের বাচ্চাটাও তার পালা মিটিয়ে গেলো।

দেয়ালে টাঙানো রবীন্দ্রনাথ। তাকিয়ে আছেন। রবি ঠাকুরের দৃষ্টিতে কি বিস্ময় ! বিদ্রোহী কবি দরজার দিকে  তাকিয়ে আছেন। সে চোখে কি ঘৃণার আগুন? হিন্দু সুস্মিতা চোখ বন্ধ করে শুয়ে আছে তার চিরচেনা বিছানায় অচেনা এক শরীর নিয়ে।


কতশতাব্দী পেরিয়ে যায়। কাল গিয়ে মেশে মহাকালে । মানবধর্ম নিয়ে কত শত আলোচনা হয়। মানুষকি বদলায়। কিন্তু পৃথিবীর কোন ধর্ম শাস্ত্রই কি বলে, মানুষকে ঘৃণা করো?
 

পীরালি

প্রতিদিনের মত আজকের সূর্য্য মাথার উপর চলে এসেছে। আজ সূর্য্য মামা মনে হয় রেগে আছে। ডিউটিতে আসার আগে মামীর সাথে একপ্রস্থ ঝগড়াঝাটি হয়ে গেছে সে তার উত্তাপ দেখেই বোঝা যাচ্ছে। রোদটা যেন খাড়াভাবে পৃথিবীর উপর পড়েছে। গাছের ছায়ায় বসা পীরালী ফকির ঘামে একদম ভিজে গেছে। ময়লা গামছাটা মেলে সে মুখ মুছে নিল। আকিকার দিন বাপে জোড়া খাসি জবাই করে নাম রেখেছিলেন পীর আলী। পীর মানে যে শিক্ষক এটা পীরালি কি তার বাবা কোনদিনই জানতো। তার বাপের ধারণা ছিলো পীর মানে আল্লাহর ওলি টাইপের কিছু একটা। জানলে কি কেউ দুই খাসি জবাই করে নাম রাখে শিক্ষক আলী! কালের ঘূর্ণিচক্রে পড়ে সেই নামটা আজ মানুষের মুখে হয়ে গেছে পীরালী। পেশা তার ভিক্ষাবৃত্তি। চার রাস্তার মোড়ে বড় শিরিষ গাছটার নিচে তাকে প্রায়ই দেখা যায়। সুর করে গজল গায়, মানুষকে আখিরাতের লোভ দেখিয়ে আল্লা-রসূলের নামে ভিক্ষা মাগে। আমি মানুষটা বড়ই লোভী। সওয়াবের আশায় পকেটের সিকি আধুলি তার প্লেটে ছুঁড়ে দেই। টিনের থালায় ঠকাস করে শব্দ হয়। পীরালী চোখ তুলে তাকায়। পান্ডুর সেই চাহনী দেখে বুঝতে পারিনা সে খুশী হল কিনা। পীরালী হাঁটতে পারে না। পঙ্গু দেহটা নিয়ে সে সাইকেলের চাকা লাগানো গাড়িটাতে চড়ে বসে। হাবিবুল্লা নামে একটা ছেলে সেই গাড়িটা ঠেলে আনে প্রতিদিন। হাবিবুল্লা পিরালির ড্রাইভার কাম হেলপার সবকিছু। দুজনের মাথায় ময়লা রঙের সাদা টুপি। পিরালী গাইতে গাইতে থেমে গেলে হাবিবুল্লাহ তার সুর ধরে, ‘বলো আল্লা-নবীজির নামছেলেটার গলা চমৎকার।

নামের মত পীরালীর জীবনটাও সঙ্কুচিত হয়ে আসছে দিনদিন। কেন জানিনা এই গ্রীষ্মের দুপুরে আজ পেছনের দিনগুলোর কথা খুব মনে পড়ছে। বড় সুখের ছিল সেই দিনগুলো। আর দশজনের মত তারও ছিল দুখানা সবল হাত, বলিষ্ঠ পা। বড় বড় পা ফেলে গ্রামের মাঠে সে হেঁটে যেত। কৈশোরে সেই পা নিয়েই সে দোস্তদের সাথে হাডুডু খেলেছে সরদারদের বড় খোলেনে। বাপের কাছ থেকে পাওয়া বিঘে খানেকজমি ছিল। যৌবনে সেটাতে চাষ দিয়ে সে সোনার ফসল ফলাত। সোনা রঙের পাকা ধানে মাঠ ভরে যেত। সেই দৃশ্য দেখে পীর আলীর বুক আনন্দে নেঁচে উঠতো। কয়েক বছর ভেতরে ঋণ-পান শোধ করার পরেও হাতে বেশ টাকা জমলো। পাশের গ্রামে বিয়ে করলো। ঘর তার আলো করে রেখেছিল পরীর মত নতুন বউ। বউয়ের নামও পরী। প-য়ে প-য়ে মিল থাকায় এক মেঠো কবি সেটা নিয়ে কবিতা বাঁধলো। কিন্তু গাঁয়ের লোকে সে কবিতা খেলো না। কবি মনোক্ষুণ্ণ হয়ে নতুন কবিতা বাঁধার চেষ্টা করতে লাগলো। পীরালী মাঠ থেকে গৃহে ফিরে দেখত নতুন বউ তার জন্য ভাত নিয়ে অভূক্ত অবস্থায় বসে আছে। মাথায় এক কোশ সরিষার তেল ঢেলে দুহাতে ঢেউ দিয়ে পুকুরের পানা সরিয়ে ফস করে গা ধুয়ে আসে সে। ছোট্ট রান্নাঘরে পিঁড়ে পেতে দুজনে খেতে বসে। বউ পিরালির শানকিতে ভাত বেড়ে দেয়। আজ বউ কাঁচকি মাছ দিয়ে রান্না করেছে আলু দিয়ে। বউয়ের হাতে রান্না কাঁচকি মাছ যেন অমৃত। পীরালী আয়েশ করে খায়। রাত গভীর হলে পশ্চিম বিলে যখন ধবধবে জ্যোৎস্না নামে তখন তারা দুজন ফিসফিস করে গল্প করে। আশেপাশে কোন প্রতিবেশী নেই। শুনে ফেলার মত কেউ ছিল না। তবু তারা ফিসফিসিয়ে গল্প করত। যেদিন সে জানতে পারে নতুন বউ পোয়াতি হইছে তার মনে শালিক খালী নদীতে যেমন জোয়ারের বান ডাকে ঠিক সেরকম আনন্দের ঢেউ জাগলো তার মনে। মনে হল পৃথিবীর সব সুখ নেমে এসেছে তার চালা ঘরে।

সুখ কখনো পীরালীর সাথে বেশীদিন সহবাস করেনা। এবারও করল না। দেশে শুরু হল যুদ্ধ। তারা বলত গন্ডগোল। শেখ সাহেব আর ভুট্টো সাহেবের মধ্যে গদি নিয়ে গন্ডগোল। গ্রামে গ্রামে খান সেনারা এসে তাম্বু গাড়ল। খানেরা সব উচু তাগড়া জোয়ান। ভাত খায় না। গোস্তের ঝোলে রুটি ডুবিয়ে খায়পীরালিরা আগে যুদ্ধ-টুদ্ধ কোন দিন দেখে নি। গ্রামের বৃদ্ধরা দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের কথা বলে। সেও তাদের দেখা নয়। শোনা কথা।

গ্রামের চেয়ারম্যান শান্তি বাহিনীর হেড হয়ে গেল। সবাইকে সে পরামর্শ দিল তৈরী থাকতে। পবিত্র এসলামের জইন্য, এসলামের জোলুশ বাড়ানির জইন্য খুব শীঘ্রি মালাউনগো বিরুদ্ধে জিহাদ করা লাইগবো। যারা পবিত্র পাকিস্তানের বিরুদিতা করে তারাও মালাউন, ফরজে কতল। তাগোও মাইরে ফেলতি হবেপীরালীর পড়ালেখা ছিল না। দেশপ্রেম, ধর্মপ্রেম বা ক্ষমতার লড়াই এসব তার বুঝে আসার কথা না। মাঝে মাঝে বোঝার সে চেষ্টা করে। আশ-পাশের গাঁ-গ্রামে খান সেনাদের কথা সে শুনেছে। কথা নেই বার্তা নেই ঠুস করে গুলি করে মারছে। পাকবাহিনীর নৃশংসতা তার রক্তে আগুন ধরিয়ে দিল। ইচ্ছে করছে ধান কাঁটা এই কাঁচি দিয়ে পাকি গো দ্বিতীয়বার সুন্নতে খাৎনা দিয়ে দিতে। সপ্তাহ না পেরোতেই তার গ্রামেও এল খান সেনা। মানুষ খুব ভয় পেল। জোয়ান বুড়োরা সব ধানক্ষেতে লুকিয়ে থাকতে লাগল। মাথার উপর প্লেনের বোঁ বোঁ শব্দ শুনলে প্রাণ লাফ দিয়ে ওঠে। এই বুঝি বোম-টোমকিছু ফেলে বসে আকাশ থেকে। কেউ জানের ভয়ে আর কেউ ক্ষমতার লোভে শান্তি কমিটিতে নাম লেখাল। চ্যারম্যান সাহেব পীরালীকেও ডেকেছিলো। পীরালী দূরে দূরেই থাকতে লাগল।  

চারদিকে কেমন একটা খাঁখাঁ ভাব। হাট-বাজার বলতে গেলে আর সেভাবে বসেই না। ঘরে বাজার সদাই নেই। ধামাটা হাতে নিয়ে পীরালী গিলেবাড়ীর হাটে গেল। অল্প কয়েকটা দোকান খুলেছে। দোকানের ঝাঁপ অর্ধেক খোলা। জিনিস-পত্তরের দাম খুব বেড়ে গেছে। পাঁচ টাকা জিনিসের দাম পঁচিশ টাকা চায়। দেশের দোকানদার গুলো হারামী পাকিস্তানীদের থেকে কোন অংশে কমে যায় না। এখনো এদের টাকা কামানোর লোভ যায় নাই। মেলেটারি আইসে যদি ঠুস করে গুলি করে তালি টাকা সাথে নিয়ে কি গোরে যাবা?’ পীরালী কবরের কথা বলায় দোকানিও ক্ষেপে গেলো। যাওতো মিয়া ইহানতে। ব্যান বেলা ক্যাচাল কইরো না। আমাগে গুলি করবে না। দুকানে পাকিস্তানের ফিলাগ লাগাই রাখিছিপীরালি দোকানের দিকে লক্ষ্য করে দেখে চাঁদ তারা আঁকা পতাকা ঝুলছে। কোনমতে কেনাকাটা করে পীরালী বাড়ির পথ ধরল। গাঙ্গ পেরোনো লাগে। পাটনি মাঝি আক্ষেপের সুরে বলল, “সারাদিনি চাইরজন মানুষ পার কল্লাম। এইরাম হলি আর বাঁচতি হবেনা। না খায়ে মুরা আর গুলি খায়ে মুরা কোনডা বেশী কষ্টের কতি পার মিয়া।পীরালী কি উত্তর দেবে ভেবে পেল না। সন্ধ্যার আঁন্ধার নামার আগে সে বাড়ির ব্যাড়ে পৌঁছে গেল।

অন্যদিন হাঁট থেকে ফেরার সময় হলে বউ ব্যাড়ের ধারে ঐ নিম গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। কতদিন সে বউকে বলেছে, “ওই রাম করে নিম গাছে তলায় দাঁড়ায় থাকপা না বউ। নিম গাছের ভূত এসে তোমার ঘাড়ে উঠবো।স্বামীর বোকামিতে বউ হাসে। কি বোকা মানুষ। নিম গাছে কি ভূত থাহে নাই! নিম পাতা হইলো তেঁতো। তেঁতো জিনিস ভূঁতের খুব অপছন্দ। দেখোনা কাউরে ভূতে ধরলে নিম গাছের ডাল দিয়ে ভূঁত তাড়ায়পীরালি হার মানে না। ভূঁত না থাক জিন তো থাকপার পারেবউ হার মানে। নিজে হার মেনে ভালোবাসার মানুষটিকে জিতিয়ে দিতে পারাটাও নিজের জয় এটা পরীবানু জানে। আজ ব্যাড় ফাঁকা। পীরালি মনে মনে বললো, বউ কোথায়! এমন তো হয় না।

উত্তরের তাল গাছে দুটো শকুন বসে আছে। শকুন দেখে ভয় পাওয়ার কিছু নেই। তালগাছ তিনটায় কয়েকপুরুষ ধরে শকুনেরা বসবাস করে আসছে। ক্ষ্যান্ত বুড়ি এসে মাঝে মাঝে বলে যায়, ‘শকুন হল অলক্ষী প্রানী, বাড়ীর সীমানায় শকুন থাকলি অমঙ্গল হয়। সময় থাকতি তাড়ায়ে দেঅত উচু গাছের মাথা থেকে শকুন তাড়াবে কিভাবে সে ভেবে পায় না। এক কাজ করা যায়, গাছ দুটো কেটে ফেলা। বাপ-দাদার হাতে লাগানো গাছ। সে কাটতে পারে না। আবার শকুন গুলোকে তাড়াতে সত্যিকারে তার মন টানে না। ঘরের দোরহাট করে খোলা। পরীবানু কোথাও নেই সারা বাড়ি খাঁ খাঁ করছে। পুকুর ঘাটে নেই। সে লাউয়ের মাচানের তলায় উঁকি দিয়ে দেখল। সেখানেও নেই। গেল কোথায়!  কারো বাড়ি গেলো নাকি? বউ তো কারো বাড়ী খুব একটা যায় না। তার এক সই আছে। কিন্তু এই পোঁয়াতি অবস্থায় সইয়ের বাড়ি যাবে কেন!

পীরালী খুঁটিতে মাথা রেখে মাটির বারান্দায় বসে আছে। দুপুরে গ্রামে পাক সৈন্যরা হানা দেয়। নতুন বউয়ের মত অনেকের খোঁজ পায় না কেউ। নতুন বউ আর কখনো ফিরে আসেনি। পীরালীর তপ্ত বুকে মাথা রেখে কেউ আর ফিসফিসিয়ে গল্প করে না।

তিনদিনের দিন পীরালী পালিয়ে গেল। সোজা বর্ডার পেরিয়ে ভারতে। যোগ দিল যুদ্ধে, বনে গেল মুক্তি। প্রতিহিংসার অনলে দাউদাউ করে জ্বলতে লাগলো তার হৃদয়। খানেদের রক্তে কেবল শীতল হতে পারে সেই জ্বালা। যশোর এলাকায় যুদ্ধ করতে পাঠানো হল পীরালীদের। যুদ্ধের সেই সব দিনের কথা মনে পড়লে আজও ছলকে ওঠে বুকের রক্ত। যুদ্ধ প্রায় শেষের দিকে। শত্রুর পোঁতা মাইনে উড়ে গেল পীরালীর এক খানা পা। বাম হাত খানা প্রায় অকেজো। বাঁচার আশা ছিল না। তবুও কি করে যেন বেঁচে গেল।



তারপর যুদ্ধ শেষ হয়ে গেল। স্বাধীন বাংলাদেশের লালসবুজের পতাকা পতপত করে উড়তে লাগলো সোনার বাংলায়। মাস কয়েক পরে অনেক কষ্টে লাঠিতে ভর করে গ্রামে ফিরল পীরালী। খোঁড়া পা নিয়ে বাড়ির দাওয়ায় সে একাকি বসে থাকত। কোন কোন দিন ক্ষ্যান্ত বুড়ি পাশে এসে বসে। যুদ্ধে এত মানুষ মরল কিন্তু সেই চেয়ারম্যানের কিছু হল না। কোন জায়গা থেকে যেন মুক্তির সার্টিফিকেট জোগাড় করে আনল। নিজেকে সে মুক্তি বলে পরিচয় দিতে লাগল। পাকিস্তান জিন্দাবাদের জায়গা দখল করে নিয়েছে জয় বাংলা। শেখ মুজিবের জন্য সে এখন জান-প্রাণ উৎসর্গ করে দেবে এমনই ভাব। কয়েকদিনের মধ্যে তার নতুন সাগরেদ জুটে গেল। এসব নিয়ে পীরালীর মাথা ব্যাথা ছিল না। একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখে চেয়ারম্যানের চেলাবেলারা তার বাড়ি দখল নিতে এসেছে। সে নাকি চেয়ারম্যানের কাছে তার বসত ভিটে বেচে দিয়েছে। গ্রামের কেউ কেউ ঘুষ খেয়ে চেয়ারম্যানের পক্ষে সাক্ষী দিলো। সেদিন পীরালীর পাশে কেউ দাঁড়ায় নি। পীরালি পৈত্রিক বাড়ি ছেড়ে বেরিয়ে পড়লো। ক্ষ্যান্ত বুড়ি তার শতচ্ছিন্ন শাড়ীর আঁচলে চোখ মোছে। তালগাছে শকুনদের সুখের ঘরকন্নার দিন শেষ হলো। শকুন হলো অলক্ষী। চেয়ারম্যান তালগাছ তিনটে কাটার ব্যবস্থা করলো। ভাঁটায় ইট পুড়িয়ে নতুন কোটাবাড়ি করবে। পীরালি ভাসতে ভাসতে সে চলে এল খুলনা টাউনে এলো। কোন উপায় না করতে পেরে মানুষের কাছে হাত পাততে হলো। প্রথম প্রথম কষ্ট হত। এখন হয় না। পীরালীর মনে হয় এভাবে বেঁচে থাকার চেয়ে একসিডেন্টের দিনেই মরে যাওয়া বোধহয় অনেক ভাল ছিল। বোধহয় কেন আসলেই ভাল ছিল।

পীরালীর পাশে কেউ বসে না। তবু পীরালী মাঝে মঝে পুরান দিনের গল্পের ঝাঁপি খুলে বসে। হাবিবুল্লাই তার গল্পের শ্রোতা। ছেলেটা এতিম। চারকূলে কেউ নেই। বছর চারেক হল সে পীরালীর সাথে আছে। পীরালী ছেলেটাকে বেশ স্নেহ করে। খাওয়ার পাশাপাশি কিছু টাকাও দিত। ছেলেটা আগে পীরালীর কথা বেশ মান্যি-গন্যি করত। কিন্তু আজকাল খুব বেয়াড়া হয়ে গেছে। সারাক্ষন টাকার জন্য ঘ্যান ঘ্যান করে। টাকা না দিলে পীরালীকে ফেলে চলে যাবার হুমকি দেয়। কিন্তু যায় না। পীরালী ভাবে তাকে ভালবাসে বলেই যায় না। আসলে লোকে ভিক্ষা দেয় পীরালীর পঙ্গু পা দেখে এই গূঢ় সত্যটা হাবিবুল্লাহ জানে বলেই তাকে ছেড়ে যায় না। পীরালী বাধ্য হয়ে টাকা দেয়। ইচ্ছা করলে নতুন কাউকে সে রাখতে পারে। প্রতিদিন কত শত হাবিবুল্লা ভেসে যায় এই টাউনের বুকে। কিন্তু হাবিবুল্লার প্রতি তার একটা মায়া জমে গেছে। নিজের ছেলের মত মায়া করে তাকে। খাওয়া-দাওয়া খরচের পর যদি টাকা বাচে তাহলে সে সেটা একটা পুটলির ভিতর জমিয়ে রাখে। বর্ষার দিনের জন্য কিছু সঞ্চয় তাকে রাখতেই হয়। মাঝে মাঝে নতুন বউয়ের কথা মনে পড়ে। নতুন বউ কি বেঁচে আছে!

হাবিবুল্লা ছেলেটা নেশা ধরেছে। যৌবনের ফুল না ফুটটেই সে বাজারের মধুবালাদের খোঁজ পেয়ে গেছে। সে আরো টাকা দাবি করে। পীরালী তো আর টাকার গাছ না। কোন জায়গা থেকে টাকা দেবে সে। হাবিবুল্লার ধারণা পীরালীর অনেক জমানো টাকা আছে। সে রেগে যায়। যা তা বলে মুখ চালায়। পীরালী নিজেকে সামলাতে পারে না। সেও গালি দেয়।

পরদিন সকালে পীরালীর ঘুম ভাঙ্গে তার ছোট্ট খুপরিতে। নিয়মমত সে বালিশের তলায় হাত দেয়। টাকার পুটলিটা সে ওখানে রাখে। আজ সে পুটলিটা খুঁজে পেল না।  হাবিবুল্লাহকেও খুঁজে পায় না। সর্বস্ব হারানো পীরালী আজ আরেকবার নিঃস্ব হল। সকালের খাওয়ার কিছু কেনার মত একটা পয়সা নেই তার কাছে। পাশের খুপরীতে থাকে ছবুর। সে কুলিগিরি করে। সব শুনে সে পীরালীকে চৌরাস্তার মোড়ে দিয়ে গেল।  

যুদ্ধ হয়েছে সেই কত কত দিন আগে। চল্লিশ বছর তো হবে। বিষন্ন চোখে বসে আছে পীরালী। চায়ের দোকানের টিভিতে খবর হচ্ছে। কোন  মন্ত্রী নাকি সেতু বানানোর টাকা নিজের বাড়িতে নিয়ে গেছে। চা খেতে আসা লোক গুলো বলাবলি করছে কিভাবে মন্ত্রী মিনিষ্টার গুলো দেশের বারোটা বাজিয়ে দিচ্ছে। পীরালী অবাক হয়। দেশও কি আজ তার মত সব হারিয়ে নিঃস্ব, নিঃসঙ্গ। অর্থহীন দৃষ্টি মেলে কালো পথের উপর চেয়ে থাকে পীরালী। পথের উপর রিকশার চাকা গড়িয়ে চলেছে। আমজনতা সবাই পীরালী হয়ে বেঁচে আছে।


 

আত্মহত্যা

নির্বিকার রাত, নিস্তব্ধ মেঘনা। নদীর বুকে স্রোত আছে কিনা বোঝা যাচ্ছে না। নদীর দুই পাশে অবস্থিত বিভিন্ন কারখানার  বিজলী বাতির ছায়াগুলো জলের উপর আপন মনে খেলা করে। যান্ত্রিক আর্তনাদে মেঘনা সেতুর উপর দিয়ে ছুটে চলে ঘুমহীন বাস-ট্রাকের দল। নির্ঘুম পাথুরে দৃষ্টি মেলে আপন মনে পিচ কালো পথের দিকে চেয়ে থাকে ড্রাইভার। আরোহীরা  ঘুলে ঢুলে ঢুলে পড়ে। ঘুমকাতুরে চোখে এক যাত্রী চোখ বাড়ালো বাসের কাচেঁর জানালার বাইরে। যাত্রীর চোখে পড়লো মেঘনা  ব্রিজের রেলিং ধরে একটি মেয়ে দাঁড়িয়ে আছে । চাঁদনী রাতব্রিজের উপর যদি পরী বা পেত্নী কিছু একটা এসে দাঁড়ায় তবে সেটা খুব বেশী অস্বাভাবিক হবে না।  শোনা যায়, পরীরা চাঁদের আলো খেতে কুহিস্তান থেকে বাংলাদেশে চলে আসে।  ঘুমের আবেশে মাতাল যাত্রীটির মাথায় কিন্তু এসব কিছুই আসেনি। সে ভেবে নিয়েছে পাগলী টাইপের কেউ। পতিতাও হতে পারে। এই নির্জন এলাকায় এতরাতে নিশিকন্যাদের কেউ কেন থাকবে সে চিন্তা কিন্তু তার মাথায় এলো না। সে আবারও ঘুমে ডুব দিলো।

রাতের ঠান্ডা বাতাস ঝাপটা মারে মুখে। কানের পাশে ঝুলে থাকা চুলগুলো বাতাসে উড়ছে। প্রতিবার গাড়ি যাওয়ার সময় ব্রিজটি থরথর করে কাঁপছে। ব্রিজটি কি তার মত ভয় পাচ্ছে। জোর হাতে আরো শক্ত করে ব্রিজের রেলিং চেপে ধরে নিরু। নিরুপমা রায়। মৃত্যুকে তার খুব ভয় করছে। তার মরতে ইচ্ছে করছে না। আজ কয়েকদিন সে অনেক ভেবেছে। কিন্তুর মৃত্যুর মত এত আপন কেউ কাউকে আর খুঁজে  পেল না। মেঘনার কালো জলের উপর সে অর্থহীন দৃষ্টি মেলে চেয়ে থাকে। গর্ভে তার প্রেমিকের ঊথিত কামনার প্রোথিত অবদান।



যে দিনটি তার কাছে ছিল এতদিন  অনেক অনেক আনন্দের, অনেক স্মৃতিময় সেই দিনটি আজ তার জন্য অভিশাপ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যে লোকটিকে সে সবার থেকে আপন ভেবেছিল- বাবা মা ভাইদের সবার থেকে খুব বেশী আপন, যার জন্য সে ক্লাস ফাঁকি দিত, ভালবাসার গল্প মাখা কল্পনার জাল বুনত। যার মাথা কোলে নিয়ে পার্কের বেঞ্চে বসে কাটিয়ে দিত ঘন্টার পর ঘন্টা। মানুষটা তো খুব বেশী খারাপ মানুষ ছিলনা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এমএসসি করছে কেমিস্ট্রিতে। চেহারায় একটু রুক্ষতা থাকলেও দেখতে সুদর্শনই মনে হত। একটু রাগী স্বভাবের ছিল। কিন্তু নিরুর সাথে কখনো রাগারাগী করত না। ঘাসের সবুজ বুকে শরীর এলিয়ে দিয়ে নিরুর উরুতে মাথা রাখত। নিরুতে দেখাত, শোনাত ভালবাসার সোনালী সুদিনের স্বপ্ন। টোনাটুনির সংসারে থাকবে শুধুই তারা দুজন। রুপকথার গল্পের আবছায়া ডানা মেলত নিরুর কল্পনায়। যৌবনের তাড়নায় তারা ছুটছিল লাগামহীন বল্গা হরিনের মত। প্রেমিকের হাত ধরে নিঃশঙ্ক চিত্তে তাই নিরু যেতে সাহস করেছিল তার মেসে। ছেলেটির রুমমেট অনুপস্থিত ছিল। আদিম উনমত্ততায় মাতোয়োরা দুজন নিজেদের বাহুডরে ক্ষণিকের সুখ খুঁজেছিল। ঘামে ভিজে সপসপে হয়ে যাওয়া নিরুর ঘনঘন শ্বাস পড়ছিল। সে জীবনের নতুন মানে খুঁজে পেল।

কয়েকটা মাস কিভাবে কেটে গেল। কিভাবে পার হয়ে গেল সে বুঝতে পারল না। যেদিন সে জানল তার দেহের মাঝে আরো একজনের উপস্থিতি, খুব ভয় পেয়ে গেল সে। ভালবাসার চেনা লোকটা অচেনা হয়ে গেল। মা কাঁদতে কাঁদতে শাড়ীর আঁচল ভিজিয়ে ফেললেন। বাবা গম্ভীর মুখে সারারাত বারান্দায় বসে থাকলেন। বড় ভাই তাকে কোনদিন তার গায়ে ফুলের টোকা লাগতে দেয় নাই। সেই বড় ভাই আজ তার মুখে জুতো খুলে ছুড়ে মারলেন। দুনিয়াটাই তার কাছে হঠাৎ অচেনা লাগছে। গভীর রাতে মা নিরুর ঘরে এল। সবাই মিলে এবরশন করার সিদ্ধান্তে এসেছে। কলঙ্ক বাড়িয়ে আর লাভ নেই। কিন্তু নিরুর ঘর ফাঁকা পড়ে আছে। কোথাও নেই সে। না বাথরুমে, না বেলকনিতে, না ছাদে। কখন বেরিয়েছে সে? তাকে কেউ বের হতে তো দেখেনি। 


কোথায় যাবে নিরু ঠিক জানতো না। বাড়ি থেকে বেরিয়ে একটা বাসে করে নিরু অনেক দূরে চলে এসেছে। নিরু দাঁড়িয়ে আছে মেঘনা ব্রিজের মাঝ বরাবর। নিরু রেলিং এর উপর উঠে দাঁড়াল। বাবা মা ভাই তাকে হাসপাতালে, আত্মীয়ের বাইতে খুঁজে ফিরতে লাগল।

কয়েকদিন বাদে প্রথম আলোর শেষ পাতায় একটা খবর বেরল। মেঘনার মোহনায় জলে ফুলে ফেঁপে ওঠা একটা মেয়ের লাশ ভেসে উঠেছে। পুলিশ সন্দেহ করছে কোন দুষ্কৃতকারীদের দল মেয়েটিকে ধর্ষন করার পর হত্যা করে মেঘনায় ভাসিয়ে দিয়েছে। স্থানীয় বিরোধীদলীয় নেতা দাবী করতে লাগল, এই সরকারের আমলে আইন শৃংখলার খুব অবনতি হয়েছে। খুন-ধর্ষন বেড়েই চলেছে। সরকারীর দলের নেতা বিবৃতি দিলো, সরকারের ভাবমূর্তি নষ্ট করার জন্য বিরোধীদলের কারসাজি এসব। অপরাধীদের খুঁজে বের করে শক্ত হাতে দমন করা হবে।
 
 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।