Visible Online for Whom You want

Now you can visible online for whom you want.By using this trick you can chat with only with the persons whom you want.
  • Just go to Advanced chat settings by clicking on Gear icon below chat bar.
  • Then a pop up arises  just like below screen capture
  • Now click Turn On chat for Some Friends
  • Now add your friends in the options
  • finally click save option.
 

লজ্জাবতী লতা : রাজেন্দ্র সিং বেদী (অনুবাদ গল্প)

দেশ ভাগ হলো। আর আহত হলো অগণিত লোক। সকলে উঠে শরীর থেকে রক্ত মুছে ফেলে। আর সকলে মিলে একজনের দিকে ছুটে যায়, যার দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, কিন্তু হৃদয় আহত। মহল্লা মহল্লায় গলিতে গলিতে আবার পূনর্বাসনসম্পর্কিত কমিটি গঠিত হয়েছে। প্রথম দিকে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যে পূনর্বাসন, জমিতে পুনর্বাসন, আর বাড়ি ঘরে পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু করা হয়। তবে একটি কর্মসূচি ছিল যার প্রতি কারও তেমন মনযোগ ছিলনা। তা হলো অপহৃত মহিলাদের উদ্ধার কর্মসূচি। এর স্লোগান ছিল হৃদয়ে পুনর্বাসনকিন্তু এই কর্মসূচির ব্যাপারে নারায়ন বাওয়ার মন্দির এবং আশে পাশে বসবাসকারী প্রাচীনপন্থী গোত্রের লোকজন প্রচ- বিরোধিতা করে।

এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মন্দিরের পাশের মহল্লা মোল্লা শুকুরএ একটি কমিটি গঠিত হয়। এগারো ভোটে সুন্দর লাল বাবুকে সম্পাদক এবং উকিল সাহেবকে সভাপতি মনোনীত করা হয়। কালান থানার বৃদ্ধ কেরানী এবং মহল্লার অন্যান্য মাতব্বর লোকদের ধারণা, সুন্দর লাল ছাড়া এই দায়িত্ব অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অন্য কেউ সম্পাদন করতে পারবেনা। কারণ সুন্দর লালের স্ত্রী অপহৃত হয়েছে আর তার নাম ছিল লাজবন্তি। অতএব, প্রভাত ফেরীর মিছিলে সুন্দর লাল, তার বন্ধু রেসালো এবং নেকীরাম ও অন্যান্যরা মিলে যখন গাইতে থাকে হাত লাই কমানী লাজওয়ান্তি দে বুটে’ (অর্থাৎ এটি একটি লজ্জাবতী লতার চারা, হাত লাগালেই সংকুচিত হয়।) তখন সুন্দর লালের মুখ দিয়ে কোনো আওয়াজ বের হয় না। সে নীরবে মিছিলে সবার সাথে এগিয়ে যেতে যেতে লাজবন্তির ব্যাপারে ভাবতে থাকে, ‘জানি না সে কোথায় কি অবস্থায় আছে। আমার ব্যাপারে কি ভাবছে। সে কি কখনও ফেরত আসবে নাকি আসবেনা?’ ইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার পা নড়বড় করে উঠে।

এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, লাজবন্তি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনাই ত্যাগ করেছে। তার দূঃখ সারা দুনিয়ার বেদনায় পরিণত হয়েছে। সে দুঃখ বেদনা থেকে পরিত্রাণের জন্য জনসেবায় আত্মনিয়োগ করেছে। অবশ্য এরপরও তার সাথীদের সাথে গানে সুর মিলাতে গিয়ে তার অবশ্যই মনে হয়, মানুষের হৃদয় কত নাজুক। সামান্য ঘটনায় আঘাত পায়। সে লজ্জাবতী লতার মতো। ওর দিকে হাত বাড়ালেই সংকোচিত হয়। কিন্তু সে লজ্জাবতীর সাথে অনেক দুর্ব্যবহার করেছে। সে তার চলাফেরা, খাবার ব্যাপারে অমনযোগী হওয়া এবং এ ধরনের মামুলী মামুলী ব্যাপারে তাকে মারধর করত।

আর লাজু শাহতুত (এক প্রকার ফলের গাছ) গাছের হালকা ডালের মতো নাজুক ফর্সা গ্রাম্য মেয়ে ছিল। রোদে ঘোরাঘুরি করায় তার গায়ের রং শ্যামলা হয়ে গেছে। তার স্বভাব আচরণে এক বিচিত্র অস্থিরতা ছিল। তার অস্থিরতা শিশির বিন্দুর মতো যেটা বড়ো পাতায় এদিক সেদিক ছুটাছুটি করে। তার দেহের গড়ন ছিল হালকা পাতলা যেটা তার দুর্বল স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয় বরং সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। তাকে দেখে প্রথমে ঘাবড়ে যায় সুন্দরলাল। কিন্তু পরে দেখল, লাজু সব ধরনের বোঝা আর দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারে। এমনকি মার খাওয়ার পরও যথারীতি সহ্য করে যাচ্ছে। তখন সুন্দর লাল লাজুর উপর তার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে জানত না, এরও একটা সীমা আছে, সীমা অতিক্রম করলে মানুষের ধৈর্য্য ভেঙে যায়। অবশ্য এর জন্য লাজুরও কিছু ভূমিকা ছিল। সে কখনও উদাস হয়ে বসে থাকতে পারে না। তাই দারুণ ঝগড়া বিবাদের পরও সুন্দর লাল মুছকি হাসলে লাজু হাসি চেপে রাখতে পারত না আর লাফিয়ে ওর কাছে চলে আসত। আর গলায় দুহাতে জড়িয়ে বলত, ‘আবার আমাকে মারলে তোমার সাথে কথা বলব না এতে সুস্পষ্ট যে, এতক্ষণের মারপিট খাওয়ার ঘটনা সে ভুলে গেছে। গ্রামের অন্যান্য মেয়েদের মতো সে জানে, পুরুষরা মেয়েদের সাথে এমনি ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য মেয়েদের মাঝে কেউ বিদ্রোহ করলে তখন মেয়েরাই হতবাক হয়ে বলতে থাকে, ‘দেখ, এ কেমন পুরুষ, মেয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না।এই মারপিটের ঘটনা তাদের গীতে উচ্চারিত হয়। স্বয়ং লাজু গাইতে থাকে-
আমি শহরের বাবুকে বিয়ে করেব না।
ওরা জুতা পরে আর
আমার নিতম্ব যে অত্যন্ত ছোটো।

কিন্তু প্রথম দফায় লাজুর শহরের এক ছেলের সাথে তার হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। তার নাম সুন্দর লাল। একটি বরযাত্রীর সাথে সে লজ্জাবতীর গ্রামে এসেছিল। সে বরের কানে কানে বলেছিল, ‘তোমার শালী তো বেশ চটপটে, তোমার স্ত্রীও চটপটে হবে।লাজবন্তি সুন্দর লালের এই কথা শুনেছিল। কিন্তু সে ভুলেই গিয়েছিল, সুন্দরলাল কিরূপ কুৎসিত জুতা পরেছিল আর তার কোমর কতখানি চিকন। প্রভাত ফেরিতে সুন্দর লালের এসব কথা মনে পড়ছে। আর সে ভাবছিল, যদি লাজবন্তিরআবার সে দেখা পায়, তবে সত্যিই সত্যিই সে তাকে হৃদয়ে স্থান দেবে আর লোকজনকে বলবে, বেচারী মেয়েদের অপহৃত হওয়ার ব্যাপারে তার কোনো অপরাধ নেই। যে সমাজে এই সব নিরপরাধ ও নিষ্পাপ মহিলাদের গ্রহণ করে না, তাকে আপন করে নেয় না, সেটা একটি গলিত পঁচা সমাজ। তাকে নিশ্চিহ্ন করা দরকার। সে এসব অপহৃতা মহিলাদের প্রত্যেক বাড়িতে পুনর্বাসনের শপথ নেয় আর তাদের এমন মর্যাদা দানের ইচ্ছা প্রকাশ করে যেমন যে-কোনো নারী, মা, বোন, স্ত্রী আর কন্যাকে দেয়া হয়। আবার সে মনে মনে ভাবে, তার আকার ইঙ্গিতেও লাজবন্তির প্রতি সংঘটিত নির্যাতনের কথা স্মরণ করা উচিত হবেনা। কারণ তার হৃদয় আহত, সেটা অত্যন্ত নাজুক যেমন লজ্জাবতী পাতা-হাত লাগালেই সংকুচিত হয়ে যায়।

অতএব, ‘হৃদয়ে পুনর্বাসনকর্মসূচিকে বাস্তবায়নের জন্য মোল্লা শুকুরমহল্লায় গঠিত কমিটি কয়েক দফা প্রভাত ফেরী বের করেছে। ভোর চার থেকে পাঁচটা হলো প্রভাত ফেরীর উপযুক্ত সময়। লোকজনের ভীড় আর ট্রাফিক জাম থাকে না, সারারাত চৌকিদারী করার জন্য জেগে থাকা কুকুরগুলো পর্যন্ত রুটি তৈরির চুল্লির পাশে কু-লী পাকিয়ে শুয়ে থাকে। বাড়িতে ভোরবেলা বিছানায় ঘুমন্ত লোকগুলো প্রভাত ফেরির আওয়াজ শুনে মন্তব্য করে, ওই সেই হৈচৈ। তারপর ধৈর্য্য সহকারে বাবু সুন্দর লালের প্রচারণা শুনতে থাকে। যেসব মহিলা নিরাপদে এপারে ফিরে এসেছে, ওরা তাদের স্বামীর বাহু বন্ধনে বুকের সাথে জড়িয়ে প্রভাত ফেরীর হৈ চৈ এর জন্য মুখে মিন মিন করে প্রতিবাদ জানায়। ঘুমন্ত শিশুরা মিছিলের আওয়াজ শুনে সামান্য সময়ের জন্য চোখ খুলে আর হতভাগ্য ফরিয়াদী আর বিষন্ন মানুষের প্রচারণার গান ভেবে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।

কিন্তু ভোরবেলা কানে যে শব্দ প্রবেশ করে তা বৃথা যায় না। সেটা সারাদিন চিন্তা রাজ্যে বাদানুবাদের মতো চক্কর দিতে থাকে। অনেক মানুষ-এর অর্থ ও বুঝতে পারে না। তবুও গুন গুন করতে থাকে। এই আওয়াজই গৃহে পুনর্বাসনের বিষয় ছিল। কিছুদিন আগে মিস মৃদুলা সারা বাই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে অপহৃত মহিলাদের হস্তান্তরের জন্য এনেছিলেন, তখন মোল্লা শুকুর মহল্লার কিছু অধিবাসী ওদেরকে পুনর্বাসনের জন্য সম্মত হয়। ওরা ওয়ারিশ শহরের বাইরে কোলা থানায় দেখা করতে গেল। অপহৃত মহিলারা এবং তাদের গ্রহণকারী লোকজন কিছুক্ষণ যাবত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মাথা নিচু করে নিজেদের সংসার পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ওরা বাড়িতে চলে যায়। রেসালো, নেকীরাম এবং সুন্দরলাল বাবু একবার মহেন্দ্র সিং জিন্দাবাদ’, একবার মোহন লাল জিন্দাবাদশ্লোগান দিতে থাকে। শ্লোগান দিতে দিতে ওদের গলা শুকিয়ে যায়।

আবার অপহৃত মেয়েদের অনেককে তাদের স্বামী, বাবা মা, ভাই বোনেরা তাদেরকে না চেনার ভান করে এবং তাদের সাথে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। অবশ্য এরা মৃত্যুবরণ করে নি কেন? নিজেদের সতীত্ব রক্ষার জন্য বিষপানে আত্মহত্যা করে নি কেন? কূপে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারত। কারণ এরা ছিল ভীরু, তাই জীবন বিলিয়ে পারে নি বরং জীবনকে বাঁচিয়ে রেখেছে।

অগণিত হাজারো মহিলা তাদের সতীত্ব লুণ্ঠনের আগে প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে কিন্তু তারা তো জানতনা, জীবিত থেকে ওরা কীইবা বীরত্ব দেখাল। পাথরের মতো চোখগুলো ওদেরকে এখন মৃত্যুকে তীর্যক দৃষ্টিতে অবলোকন করছে। এমনকি স্বামীরা পর্যন্ত ওদেরকে চিনতে পারছে না। অনেকে বার বার নিজের নাম উচ্চারণ করছে। সোহাগ দানী, সোহাগ বিন্তি, তাদের ভাইদের অগ্নিমূর্ত্তি দেখে সর্বশেষ মিনতির সুরে বলছে, ‘বাহারী তুমিও আমাকে চিনলে না? আমি তোমাকে কোলে বসিয়ে খাইয়েছি।আর বাহারী চিৎকার করতে চায় তারপর মাতা পিতার দিকে তাকায়। বাবা মা বুকে হাত রেখে নারায়ণ বাবার দিকে তাকায় এবং অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় নারায়ণ বাবা আকাশের দিকে তাকায়; যার আসলে কোনো বাস্তবতা নেই এবং সেটা ছিল আমাদের দৃষ্টির ভ্রম। এর একটি সীমারেখা আছে। যার উপরে আমাদের দৃষ্টি যায় না।


কিন্তু সামরিক বাহিনীর ট্রাকে মিস সারা বাই বিনিময়ের জন্য যেসব মহিলাদের এনেছিল, ওদের মাঝে লাজু ছিল না। সুন্দর লাল অনেক আশা নিয়ে ট্রাক থেকে অবতরণকারী শেষ মেয়েটিকে পর্যন্ত দেখেছে। অতঃপর সে নীরবে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে কমিটির তৎপরতা শুরু করে। এখন সে শুধু ভোরে প্রভাত ফেরী তো আছেই বরং সন্ধ্যায় ও মিছিল বের করে। অনেক সময় এক-আধ ঘণ্টা স্থায়ী ছোটোখাটো জনসভারও আয়োজন করছিল। এই জনসভায় কমিটির বৃদ্ধ সভাপতি উকিল কালকা প্রসাদ সুফির কাশি মিশানো বক্তৃতা শোনা যেত। রেসাল সর্বদা উকিল সাহেবের পাশে পিকদানি নিয়ে দায়িত্ব পালন করত। লাউড স্পীকার থেকে বিচিত্র আওয়াজ আসত। থানার নেকীরাম কেরানী বক্তৃতা দিতে গিয়ে ধর্ম শাস্ত্র ও পুরানের আলেক উদ্ধৃতি দিত আর উদ্দেশ্য বিহীন বক্তব্য রাখত। ফলে উপস্থিত দর্শকরা মাঠ ত্যাগ করতে শুরু করত। তখন সুন্দরলাল বাবু বক্তৃতা দিতে মাইকের সামনে হাজির হতো। কিন্তু সে দুটি বাক্যের বেশি কোন কথাই বলতে পারত না। তার গলায় কথা আটকে যেত। অবশেষে বসে পড়ত। তিনি কেঁদে ফেলতেন, দু চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইত। আবেগ আপ্লুত হওয়ায় বক্তৃতা করতে পারতেন না। কিন্তু উপস্থিত জমায়েত শ্রোতার মাঝে এক বিচিত্র- ধরনের নীরবতা বিরাজ করত। সুন্দর লাল বাবুর দু বাক্যের বক্তব্য তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করত; উকিল কালকা প্রসাদ সুফির উপদেশমূলক বক্তৃতাকে ও ছাড়িয়ে যেত। উপস্থিত শ্রোতারা তখনই কেঁদে ফেলত আর আবেগ আপ্লুত হয়ে চিন্তামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরত।
 

ঘোড়া চোর : এরস্কিন কল্ডওয়েল (অনুবাদ গল্প)

লুড মুসুলির দ্রুতগামী ক্যালিকো ঘোড়াটি আমি চুরি করিনি যদিও চারপাশে প্রচার করা হচ্ছে আমিই চুরি করেছি। যারা আমাকে জানে তারা কখনোই বিশ্বাস করবেনা যে, এ ধরনের একটি কাজ আমি করতে পারি। মি. জন টার্নারকে আমি প্রধান সাক্ষী মানছি, আপনারা তাকেই জিজ্ঞেস করুন। সেই বাল্যকাল থেকে তিনি আমাকে জানেন। বিশ্বাস করুন, ঘোড়া চোর হওয়ার জন্য আমি বড় হইনি। গত পরশু রাতের কথা, এক জায়গায় যাব স্থির করে মনের কথাটা মিঃ টার্নারের কাছে প্রকাশ করি। গত দুবছর ধরেই ছুটির দিনগুলো আমি ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়িয়েছি।বরাবরই উৎফুল্লচিত্তে তিনি আমাকে বিদায় জানিয়েছেন। ঘোড়া, গদি দিয়ে আমার ভ্রমণকে সুখময় করেছেন। আমার প্রস্তাব শুনে তিনি খুশি হলেন, কাজের অবসরে বেড়ানোটাকে তিনি যথেষ্ট মূল্য দিয়ে থাকেন। বললেন, বেশ তো যাও। বেটসিকে (বেটসি একটি মাদি ঘোড়ার নাম) নিয়ে যেও। ও আমার মতো তোমার সফরকেও আনন্দময় করে তুলবে। ও হ্যাঁ, ‘টেকসাস সেডেলগদিটাও নিয়ে যেও।

তাঁর এই দিলখোলা আচরণ আমার খুবই ভাল লাগে। হেসে জবাব দেই, না গদিটদির আমার দরকার নেই, চাবুক আর লাগামটা হলেই চলবে। এতেই আমি স্বচ্ছন্দবোধ করব। তাছাড়া আমি যেখানে যাচ্ছি ওখানে যাওয়ার জন্য টেকসাস সেডেলএর মতো মূল্যবান গদির প্রয়োজন পড়ে না। এ সফর আমার একান্তই ব্যক্তিগত। পথে আমাকে ডেকে থামানোর অধিকারও কারো নেই।

মিঃ টার্নার বলবেন-অবশ্যই বলবেন কোনো সমস্যায় জড়িয়ে পড়ার জন্য সে রাতে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাইনি। তিনি আমার সারাজীবনের খবর রাখেন। অতীতে তাঁকে কিংবা অন্য কাউকে কখনো আমি বিপদে ফেলিনি।

আমি যখন বেটসিকে নিয়ে মি. টার্নারের আস্তাবল ত্যাগ করি রাতের খাবারের সময় তখন অতিক্রান্ত। মি. টার্নার উঠোনে এসে দাঁড়ালেন এবং আবারও জিজ্ঞেস করলেন যে, গদি আমি নিতে চাই কি-না। ঘোড়ার পিঠে সামান্য কুঁজো। আমি সেটাকে গুরুত্ব দিলাম না। বললাম, খালি পিঠে চড়তে আমার খারাপ লাগে না। তিনি তখন সহাস্যে বললেন, ঠিক আছে তোমার যেমন ইচ্ছে। তিনি আমাকে কিছুটা পথ এগিয়ে দিলেন, ঘোড়া ছোটানোর আগ পর্যন্ত তিনি বেটসির গলা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং কৌশলে জানতে চেষ্টা করলেন কোথায় যাচ্ছি- যদিও তিনি তা আগে থেকেই জানতেন। আমার মনে হলো বিদায়বেলায় তিনি ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতে চেয়েও বললেন না- আমি যাওয়া স্থগিত করতে পারি এই ভেবেগেট পেরিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই বিশপের ক্রসরোড অতিক্রম করে ফেললাম। অন্ধকার ছিল, তবু একবার পেছনে ফিরে দেখলাম উঠোনের গেটে দাঁড়িয়ে মি. টার্নার একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। নতুন রাস্তায় পড়ে বেটসি ধীরে ধীরে এগোতে থাকে। প্রতিদিনের মতো আজ আর তাড়াহুড়ো করলাম না। কারণ পরিশ্রান্ত ছিলাম। তাছাড়া তিন কিলোমিটার পথে নষ্ট করার মতো দুঘন্টা সময় আমার হাতে ছিল।

লুড মুসুলির কনিষ্ঠ কন্যা নাওমির সঙ্গে আমি দেখা করতে যাচ্ছি, পথ পাশের যারা আমাকে চিনত তারা সবাই তা জানত। নাওমি অপূর্ব সুন্দরী মহৎ হৃদয়ের একটি মেয়ে। তার সঙ্গে আমার বেশ কদিন দেখা হয়নি। তাই সে বলেছিল, যে কোনো উপায়ে যেতে। বলেছিল, উঠোনের গাছগুলোর নিচে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা করো।

পৃথিবীতে আমার এমন কোনো সম্পদ কিংবা প্রভাব-প্রতিপত্তি নেই, যা নিয়ে আমি মি. মুসুলির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারি। অতি মামুলি একজন মানুষ আমি। কিন্তু নাওমির জন্য আমার ভালবাসা মামুলি নয়। এখন মি. টার্নারই আমার একমাত্র ভরসা। দুর্দিনে তিনি আমার পাশে দাঁড়াবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে। একটা মাত্র সপ্তাহ আমি নাওমিকে দেখতে পাইনি। ওটা তেমন কি আর দীর্ঘ সময়। তবু নাওমির ওপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে ও আমাকে ভালবাসে না কিংবা কখনোই বলেনি গিয়ে দেখা করতে। তাহলে নিশ্চয়ই তার বাবা আমাকে বাড়ির গেট থেকে বিদায় করে দিতে পারতেন না। বলতে পারতেন না, তোমার আসবার প্রয়োজন নেই।

মি. মুসুলি মনে করেন নাওমির সঙ্গে আরেকবার দেখা হলেই আমরা পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব। তখন আর তিনি আমাদের ধরার সুযোগ পাবেন না। তাই তিনি একটু মাত্র ভুলের জন্য আমাকে তার ঘোড়া চুরির অপবাদ দিয়ে বিশ বছরের জন্য মানব সংশোধনী জেলে পাঠিয়ে দেয়ার সুযোগ নিচ্ছেন। তিনি নিজেও জানেন-চুরি যে আমি করিনি। তবু এইত সুযোগ পথের কাঁটা সরিয়ে দেয়ার। তিনি মনে করেন, অপদার্থটাকে কোনো রকমে জেলে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই নাওমির অন্যত্র বিয়ে দেয়ার পক্ষে আর কোনো বাধাই থাকবে না।

গত পরশু বৃহস্পতিবার রাতে বেটসির খালি পিঠে চড়ে আমি যখন নাওমিদের বাড়ির কাছে যাই, রাত তখন নটা। বাড়ি ও তার চারপাশের সবকিছুই তখন শান্ত এবং স্বাভাবিক। ওটা লুড মুসুলির শুতে যাওয়ার সময়। আমি গোলাবাড়ির উঠোনের গেটে গেলাম। সেখান থেকে নাওমির ঘরের বাতি দেখা যাচ্ছিল। ওই ঘরে সে আর তার বড় বোন মেরি লি থাকে। আমরা সব সময় লির নটা ত্রিশে ঘুমোতে যাওয়ার পরই মিলিত হতাম। জানালা দিয়ে উঁকি দেই। দেখি নাওমি শুয়ে আছে। আর তার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে তার বোন মেরি লি কিছু একটা বিষয়ে কথা বলছে। কিন্তু হঠাৎ দেখি মেরি লি নাওমির শরীর থেকে পোশাক খুলে নিতে চেষ্টা করছে। হয়ত রাতে যাতে বের হতে না পারে সে জন্যই এ ব্যবস্থা। আমার খুব খারাপ লাগছিল। কারণ, এরপর নাওমিকে আবার অন্ধকারে লুকিয়ে পোশাক পরে আমার কাছে আসতে হবে। আমার মনে হয়, মেরি লির সঙ্গে চালাকি না করে সব কথা তাকে খুলে বললেই ভাল হতো। তাহলে সে হয়ত আমাদের সহায়তা করত। কিন্তু নাওমি কিছুতেই রাজি হয় নি। বলাটাকে সে ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেছে। কিন্তু মেরি লি তার সব চালাকি বুঝতে পারত। তাই সে সুযোগ খুঁজছিল আমাদের জব্দ করার জন্য। আমার উপস্থিতি আঁচ করতে পেরেই সে ঘুমোতে যাওয়ার ছলে তার বাবাকে গিয়ে বলল। নাওমিও অল্পক্ষণের মধ্যেই বোনের চালাকি বুঝতে পারে এবং বিছানা থেকে উঠে নিজেই পোশাক খুলে ফেলল। আমি কিছুই জানতে পারিনি। গাছগুলোর নিচে অপেক্ষা করতে থাকি। পনেরো মিনিটের মতো সময় কেটে যায়। বোনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নাওমি কিভাবে বেরিয়ে আসেতাই দেখতে বড় ইচ্ছে করছিল।


আর তখনই হঠাৎ মুসুলির ঘরের জানালা খুলে গেল। আমি নিজেকে আড়াল করতে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। এভাবেই অপেক্ষায় থেকে থেকে রাত গড়িয়ে যায়। আর নাওমির আসার সম্ভাবনা ক্রমশই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর হয়ে যায়। বাড়ি ফিরব বলে স্থির করি। রাত তখন সাড়ে বারোটা কি একটা। চাঁদ মেঘের আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে মুসুলির গোলাবাড়ির উঠোন। সামনে আমি আমার নিজের হাতই দেখতে পাচ্ছি না। বেটসিকে বের করে আনতে গেলাম। গিয়ে দেখি আস্তাবলের দরজা খোলা। অন্ধকার হাতড়ে বেটসিকে খুঁজতে থাকি, আস্তাবলের এক কোণে তার পশ্চাৎপাশে আমার হাত পড়ল। কিন্তু মুখে তার লাগাম নেই। ভাবলাম, লাগাম হয়ত খুলে ফেলেছে। মাটিতে পায়ের সাহায্যে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। দরজার কাছে মি. মুসুলির ঝুলিয়ে রাখা একটা লাগাম পেয়ে গেলাম। সেটা লাগিয়েই বেটসিকে নিয়ে রাস্তায় নেমে এলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসুলির এলাকা পার হয়ে এলাম। বাড়ি পৌঁছে বেটসিকে আস্তাবলে বেঁধে রেখে যখন শুতে গেলাম রাত তখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে।
 

চোখ : জয়ন্ত মহাপাত্র (অনুবাদ গল্প)

ও চোখ দুটো বন্ধ করল। খুব আবছা হাসির টুকরো ঠোঁটের কোণে। মেনে নেওয়ার হাসি। একেবারে নিজস্ব। আর ঠিক তখনই আমার মনে ঝিলিক দিয়ে গেল, ও যা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে এই মুহূর্তে তা আমাদের দুজনের। দুজনকেই ভাগ করে নিতে হবে। তা না হলে এই যে আলো দোদুল্যমান আলো আমাদের যাপনে এখনতা নিভে যাবে। ফুসমন্তরে । আলো -আঁধারিতে দেখি ওর চোখের পাতা কেমন তিরতির করে কাঁপছে। নিজেকেই বুঝি স্তোক দিয়ে যাই, হয়ত অনেক করে চাওয়া এক দুকণা সুখের কুচি এখনও পড়ে আছে কোথাও। ওর মনের কোণের বাইরে।
মাথাটা একটু নামিয়ে একটা চুমু খেলাম । ওর বন্ধ চোখের পাতায়।

একটু উষ্ণ, একটু বা বুঝি ভিজে। ইদানীং যেমন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, আজ তেমনটি করল না । আমাকে মেনে নিল ওর নিশ্চুপ অভিব্যক্তিতে। এ এক এমন নীরবতা, যা নির্মমভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিনতায়, সটান প্রবেশ করছে আমার শরীর ভেদ করে। অনেক অনেক অচেনা দূরত্ব পেরিয়ে কানে আসে ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ। বেলাভূমিতে। এই ধ্বনি আমাদের অতীত আর ভবিষ্যৎ জুড়ে বিছিয়ে; এই ধ্বনি অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে রেশমি সুতোর ফাঁস। এই ধ্বনি আমার মনের মধ্যে প্রায় নিভু নিভু স্মৃতির প্রদীপের সলতেটাকে কেমন উসকে দেয়। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে ওকে খুব শান্ত অথচ অচঞ্চল ভাবে শুইয়ে দিলাম খাটে।

জিজ্ঞেস করলাম, ব্যথা করছে কি ? ঠিক প্রশ্ন নয়, অনেকটা বক্তব্যের ধাঁচে। খুব সন্তর্পণ অনুভব। আসলে কী যে বলব, বুঝে উঠতে পারি না। সকালে শ্যাম্পু করেছিল। সানসিল্ক। সেই খুব হালকা মিষ্টি গন্ধটা আমার নাকে আসছে। কেমন একটা অস্বস্তি মাথার মধ্যে টুংটাং টুংটাং ।

জবাবে শুধু মাথা নেড়ে নাএর মধ্যেই চোখ খুলেছে দৃষ্টি থমকে আছে মেঝেতে ; আমার পায়ের কাছে। আমি জানালা পেরিয়ে বাইরে তাকিয়ে; দূরে বিশাল নদীগর্ভ ঢাকতে চেষ্টা করছে আসন্ন রাত্রির অন্ধকার। আর আমার দেখার ফাঁকে ফাঁকে কেমন টিপটিপ করে জ্বলে উঠছে রক্তবিন্দু। লাল আলো। সেতুর ওপরে। ইস্পাতের শীতল স্তম্ভগুলি সাজিয়ে।
ইতিমধ্যেই রাত ঘনিয়ে এসেছে । অন্ধকারের মুখে অনেকটা যেন প্রীতম সিংয়ের ক্যানভাসে আঁকা মেয়েদের মুখের আদল নিষ্কম্প, চিন্তিত। ঘন কালচে নীল রাতের আকাশ। একটু কি বঙ্কিম বিদ্রূপ লেগে আছে? ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা। অপেক্ষা। সূর্যোদয়ের। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমি যেন অনুভব করছি এক অদ্ভুত অহিতেচ্ছা । হয়ত এই অন্ধকার আমার ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে বাইরে; আমাদের বাড়ির ঠিক বাইরে ওই শূন্য চবুতরায় আমরা হাঁটছি সামনে পেছনেশুধু হাঁটছি
নদীর বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে এলো স্টিমারের ভোঁ। গম্ভীর, থমথমে রাগী । আচমকা কেমন জোয়ারের মতো আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে পরাজয়ের ঢল।

আমি তাকালাম ওর দিকে। ও নিশ্চুপ। একটু ঝুঁকে পড়া পিঠ। খাটের ওপর।
একটুও নড়েনি । ওর সীসের মতো ভারী নিস্তব্ধতা আমার দম বন্ধ করে দিচ্ছিল।
আমার কেন মনে আসছে একটা মরা গাছ নুয়ে আছে পাহাড়ী ঝোরার ওপর?
তুমি কি ভাবো আমি সত্যি সইতে পারব? যদি তুমি চলেই যাও …? আমি কিছুতেই এই কথাটা মনে মনেও উচ্চারণ করে উঠতে পারি না। এ এক এমন বাক্যবন্ধ, যার নিঃশব্দ অভিঘাত অনুভব করা মোটেই সহজ নয়। মাত্র ছাব্বিশ বছরের সুন্দরী তরুণী স্ত্রী আমার অন্ধ হয়ে যাচ্ছে ।

ফিরে এসেছি সরকারী হাসপাতালের চোখের ডাক্তার দেখিয়ে। আপাতত ওই নাকে চশমা -আঁটা কঠিন চোখ মুখের লোকটা আমাদের মন জুড়ে বসে। যা বলেছে, কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায় স্রেফ মিথ্যে কথা কারণ ওর মুখ ছিল অভিব্যাক্তিবিহীন। আমরা ওকে বিশ্বাস করছি, আবার যেন পুরোপুরি আস্থা রাখতেও পারছি না।
ঠিক মনে হচ্ছে আমাদের জীবনটা যেমন হবার, তেমনটা হয়েই গেছে ..এবার ওই রাস্তাতে যতটা সম্ভব সাবধানে পা ফেলতে হবে।

ওর না জানি কী ভীষণ খারাপ লাগছে । আমার ভেতরে বসে থাকা কেউ ফিসফিস করে বলছিল। সাহসই নেই আমার ওর দিকে অনুকম্পার চোখে তাকানোর। যে অর্ধস্বচ্ছ তরল ও গত দুবছর ধরে ব্যবহার করছে, যে তীব্র আলোর রশ্মি ওর কোমল চোখের তারা ভেদ করেছে বারবার নিষ্ঠুরতায় একের পর এক হাসপাতালে আমি নিশ্চিত, ও এতদিনে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। ওর চূড়ান্ত অস্বস্তি, কষ্ট কী ভীষণভাবে প্রকট ওর মুখে ! আমার খুব ইচ্ছে করে, যেভাবে পারি ওকে খানিক স্বস্তি দিতে।

ও শোবার ঘরে। আমি ভেতরে ঢোকার আগে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঠিক পাশের ঘরটায় পায়চারী করলাম খানিকক্ষণ। কেমন একটা ক্লান্তিকর দোটানা ভাব আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সটান গিয়ে দাঁড়ালাম ওর আয়নাটার সামনে। দাঁড়িয়েই রইলাম। কিছুই না করে । নির্দিষ্ট কোনো কিছুই করছিলাম না আমি। দেখছিলামও না। শার্টের কলারটা অনাবশ্যকভাবেই ঠিকঠাক করার চেষ্টা। সত্যি, আমি একেবারে চাইছি না ওর মুখোমুখি হতে আমার এই বোকা বোকা ঢুলুঢুলু আধফোটা হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখে ! এ নিছক অপ্রস্তুত হাবভাব লুকোনোর চেষ্টা ছাড়া তো আর কিছুই নয় ! আর এই মুহূর্তে বুঝতেও পারছিলাম, আমার নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তির আপাত দুর্ভেদ্য বর্ম কেমন ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়ছে।
আচ্ছা, আমাদের মতো দুর্বল মানসিকতার মানুষরা কি এভাবে শুধু চুপকথার খেলা খেলে যায় আজীবন ?
মনে হল, একটা কিছু পানীয় নিয়ে আসি . হয়ত ও একটু সহজ হতে পারবে ।

বরফ-ঠাণ্ডা দুধের গ্লাসের দিকে এক ঝলক তাকাল ও। আমি গ্লাস এগিয়ে ধরেছি ওর সামনে। হাসতে পারলে হাসতাম; কিন্তু হাসতে আর পারছি কই ! মেকি হাসিও নয়।

খানিক বেখাপ্পাভাবেই বললাম, নাও, দুধটুকু খেয়ে নাও। ভালো লাগবে । ও কেমন শক্ত হয়ে গেল ।
আমার দিকে তাকাল। দ্রুত, রাগী ভঙ্গিতে। এই দুটি চোখ ছায়াছায়া গভীর মায়াময় হতে পারে। বেশিরভাগ সময়ে। আমি অন্তত সেভাবেই চিনেছি। কিন্তু সেই মুহূর্তে দৃষ্টিতে এমনই তীব্রতা যা আমারই নিজেকে এক ভিনগ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হচ্ছিল। কিংবা চিড়িয়াখানার। এক ঝটকায় ও দুধভর্তি গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে।

একটুক্ষণের জন্য আমি হতচকিত। নির্বাক।
 

লেপ : ইসমত চুঘতাই (অনুবাদ গল্প)

শীতে যখন গায়ে লেপ চড়াই, তার ছায়াগুলো দেয়ালে দোলে যেন হাতির মতো। সেটা আমাকে ছুটিয়ে নিয়ে যায় অতীতের গোলকধাঁধায়। জানি না, তখন কী যে সব মনে পড়ে যায়।

মাফ করবেন। আমি আপনাকে আমার নিজের লেপ নিয়ে কোনো রোম্যান্টিক গল্প শোনাতে যাচ্ছি না। এটাকে রোম্যান্টিক বিষয় বলাটাও শক্ত। আমার মতে, কম্বল একটু কম আরামদায়ক এ-কথা সত্য, কিন্তু তার ছায়া ততোটা ভয়ানক হয় না, যতোটা হয় লেপের ছায়া দেয়ালে দুলতে থাকলে।

এটা যখনকার কাহিনী, তখন আমি ছোট্ট একটা মেয়ে এবং দিনভর ভাইদের আর তাদের বন্ধুদের সঙ্গে মারপিট করে কাটিয়ে দিতাম। মাঝে মাঝে ভাবতাম, আমি হতভাগী এতো ঝগড়টে-মারকুটে কেন? ওই বয়সে আমার অন্যান্য বোনেরা যখন তাদের চারপাশে প্রেমিকদের ভিড় জমিয়ে তুলছে, তখন আমি আপন-পর সব ছেলে আর মেয়ের সঙ্গে মারামারি-হাঁকাহাঁকিতে মশগুল।
এ-কারণেই আম্মা আগ্রা যাওয়ার সময় আমাকে হপ্তাখানেকের জন্যে তাঁর এক পাতানো বোনের কাছে রেখে গেলেন। আম্মা খুবই জানতেন যে, তাঁর ওখানে এমনকি একটা ইঁদুরের বাচ্চাও নেই যার সঙ্গে আমি ঝগড়া-মারপিট করতে পারবো। খুব কঠিন সাজাই হয়েছিলো বটে আমার! হ্যাঁ, তো আম্মা আমাকে বেগম জানের কাছে রেখে গেলেন।

এই বেগম জানের লেপ-ই আজ পর্যন্ত আমার স্মৃতিতে গরম লোহার ছ্যাঁকা দেয়া দাগ রেখে গেছে। এ-ই সেই বেগম জান, যাঁর গরিব বাবা-মা নবাব সাহেবকে এজন্যেই দামাদ বানিয়েছিলেন যে, মানুষটার বয়স একটু বেশি হলেও তিনি ধার্মিক, সচ্চরিত্র। কেউ কখনো তাঁর বাড়িতে নাচনেওয়ালি বা বাজারে মেয়েছেলে দেখেনি। তিনি নিজে হজ করেছেন এবং আরো অনেককে করতে সাহায্য করেছেন।

তবে তাঁর একটা অদ্ভুত ধরনের শখ ছিলো। লোকে শখ করে পায়রা পোষে, বুলবুলির বা মোরগের লড়াই দেয়। কিন্তু এ-ধরনের বাহ্যিক খেলা নবাব সাহেবের পছন্দ ছিলো না। তাঁর ওখানে তো শুধু তালেব এলেমরা থাকতো। নওজোয়ান, ফর্সা ফর্সা, সরু কোমরের ছেলে, যাদের সব খরচ তিনি নিজেই বহন করতেন।

কিন্তু বেগম জানকে বিয়ে করে তাঁকে বাড়ির অন্যসব আসবাবপত্র, সাজসজ্জার সঙ্গে রেখে দিয়ে তিনি বেমালুম ভুলে গেলেন। আর সেই হালকা-পাতলা লাজুক সুন্দরী বেগম তো মনোকষ্টের আগুনে পুড়তে লাগলেন। কে জানে তাঁর জীবন কোথা থেকে শুরু হয়েছিলো? যেখানে তিনি জন্ম নেয়ার ভুলটা করে ফেলেছেন সেখান থেকে? নাকি যখন এক নবাব সাহেবের বেগম হয়ে এসে খাটপালংকের ওপর জীবন কাটানো শুরু করলেন সেখান থেকে? নাকি যখন থেকে নবাব সাহেবের এখানে ছেলেদের ভিড় জমতে শুরু করলো, ওদের জন্যে রসুইখানা থেকে মুরগ্গন হালুয়া আর আরো নানা রকমের সুখাদ্য যেতে লাগলো এবং বেগম জান বৈঠকখানার খিড়কি দিয়ে চুস্ত পাজামা আর আতরমাখা পাতলা ফিনফিনে কুর্তা পরা ছিপছিপে কোমরের সুদেহী ছোকরাদেরকে দেখে দেখে তপ্ত কয়লার আগুনে জ্বলতে লাগলেন, তখন থেকে?

নাকি স্বামীর মন ফিরে পাওয়ার জন্যে যত মানত-মুরাদ যখন হার মেনে গেলো, চিল্লা বাঁধা আর টোটকা আর রাতের অজিফাখানিও ব্যর্থ হয়ে গেলো তখন থেকে? পাথরকে কি কখনো জোঁকে ধরে! নবাব সাহেব নিজের জায়গা থেকে একচুলও নড়লেন না। বেগম জানের দিল ভেঙে গেলো এবং তিনি পড়াশোনার দিকে মন দিলেন। কিন্তু সেখানেও তাঁর কিছুই মিললো না। গুচ্ছের যতো প্রেমের উপন্যাস আর আবেগ্লাপুত কবিতা পড়ে পড়ে তাঁর মন আরো খারাপ হয়ে পড়লো। যে-প্রেম তিনি কখনো পান নি, তার জন্যে হা-হুতাশ করতে করতে তাঁর বিনিদ্র রাত কাটতে লাগলো।

চুলোয় ঢেলে দেয়া উচিত এসব জামাকাপড়, সাজপোশাক! জামাকাপড় পড়ে লোকজনকে দেখানোর জন্যে। ওদিকে ফিনফিনে কুর্তাওয়ালাদেরকে ছেড়ে এদিকে একটু নজর দেয়ার ফুরসতও তো নবাব সাহেবের হয় না, আবার তাঁকেও কোথাও যেতে-আসতে দেন না। অবশ্য আত্মীয়-স্বজনরা মাঝেসাজে আসে এবং কেউ কেউ মাসকয়েকও থেকে যায়, কিন্তু তিনি বেচারি নিজের বাড়িতে যে-কয়েদি সে-কয়েদিই থেকে যান।

ওসব আত্মীয়-স্বজনকে দেখে তাঁর রক্ত আরো বেশি গরম হয়ে যায়। সবাই মুফতে মজা মারার তালে আসে। ভালো ভালো খায়-দায়, শীতের সব পোশাক-আশাক, জিনিসপত্র বানিয়ে নেয়, আর উনি তাঁর নতুন শিমুল তুলোর লেপ গায়ে জড়িয়েও ঠাণ্ডায় কুঁকড়ে থাকেন। যতোবার তিনি নড়েন-চড়েন বা পাশ ফেরেন, লেপটা নতুন নতুন চেহারা বানিয়ে দেয়ালে ছায়া ফেলে। কিন্তু সেখানে এমন একটাও ছায়া ছিলো না যেটা তাঁকে বাঁচিয়ে রাখার জন্যে যথেষ্ট। কিন্তু কেন-যে কেউ বেঁচে থাকে? জীবন! বেগম জানের জীবন যেমনটি ছিলো! কিন্তু ভাগ্যে লেখা ছিলো বেঁচে থাকাটা, তাই তিনি আবার বাঁচতে লাগলেন আর প্রাণভরে বাঁচতে থাকলেন।

তিনি নিচে পড়ে যেতে যেতে রব্বো-ই তাঁকে সামলে নিলো। চটপট দেখতে দেখতে তাঁর দুবলা-পাতলা শরীর ভরভরন্ত হতে শুরু করলো। গাল চকচকে হয়ে উঠলো আর রূপ যেন ফেটে পড়লো। এক অদ্ভুত-আজব তেল মেখে নাকি বেগম জানের জীবনে এই ঝলক এসেছে। মাফ করবেন, সে-তেলের প্রস্তুতপ্রণালী ভালোর চেয়ে আরো ভালো সাময়িকীগুলোতেও খুঁজে পাবেন না।

বেগম জানকে আমি যখন দেখি তাঁর বয়স তখন চল্লিশ-বিয়াল্লিশ বছর। ওহ্! তখন তিনি তাকিয়ায় গা এলিয়ে বসা এক শান-শওকতের প্রতিমূর্তি। রব্বো তাঁর পিঠের সাথে হেলান দিয়ে বসে তাঁর কোমর মালিশ করে দিচ্ছিলো। বেগুনি রঙের এক দোশালা তখন তাঁর পায়ের ওপর পড়ে ছিলো এবং তাঁকে এক মহারাণীর মতো মহিমান্বিত মনে হচ্ছিলো। তাঁর চেহারা দেখে আমি মুগ্ধ হয়ে গিয়েছিলাম। আমার মন চাইছিলো, ঘন্টার পর ঘন্টা শুধু কাছে বসে থেকে থেকে তাঁর রূপ দেখি। তাঁর গায়ের রং ছিলো ধবধবে ফর্সা। তাতে তিলমাত্র দাগ বা ম্লানিমা ছিলো না। তাঁর চুল চিলো কুচকুচে কালো আর চুপচুপে করে সুগন্ধী তেল মাখানো। আজ পর্যন্ত আমি কখনো তাঁর সিঁথি একটুও আঁকাবাঁকা হতে দেখি নি বা একটা চুলও এধার-ওধার সরে যেতে দেখি নি। তাঁর চোখ ছিলো কালো এবং বাড়তি রোম উপড়ে ফেলায় ভুরু দুটো দেখাতো টান টান ধনুকের মতো। চোখ দুটো সামান্য নত হয়ে থাকতো। চোখের পাতাগুলো ছিলো ভারী আর পালকগুলো ঘন। তবে তাঁর চেহারায় সবচেয়ে নজরকাড়া জিনিস ছিলো তাঁর ঠোঁট। প্রায়শই সে-ঠোঁট লিপস্টিকে রাঙানো থাকতো। ওপরের ঠোঁটের ওপর হালকা একটু গোঁফের মতো কোমল রোম ছিলো, এবং কানের ওপর দিয়ে লতিয়ে থাকতো লম্বা লম্বা চুল। মাঝে মাঝে তাঁর চেহারার দিকে তাকিয়ে অদ্ভুত লাগতো, যেন এক নিতান্ত অল্পবয়সী মেয়ে।

তাঁর ত্বকও ছিলো সফেদ, মসৃণ, জেল্লাদার, যেন কেউ সেটাকে বেশ টান টান করে তাঁর দেহের ওপর সেলাই করে দিয়েছে। যখন তিনি চুলকানোর জন্যে পায়ের কাপড় সরাতেন, তখন আমি চুরি করে তাদের জৌলুস দেখতাম। উনি এমনিতেই যথেষ্ট লম্বা ছিলেন এবং তার ওপর প্রচুর মেদ-মাংস জমা হওয়ায় তাঁকে বেশ লম্বা-চওড়া দেখাতো। কিন্তু বড় রোগবালাই বা বাতিক আক্রান্ত শরীর। তাঁর হাত দুটো বড় বড় আর মসৃণ এবং কোমর সুডৌল হলে কী হবে, রব্বোকে সারাক্ষণ তাঁর পিঠ চুলকোতে হতো। অর্থাৎ কিনা ঘন্টার পর ঘন্টা পিঠ চুলকোনো, যেন পিঠ চুলকোনোটাও জীবনের জরুরি প্রয়োজনের মধ্যে পড়ে, কিংবা হয়তো জরুরি প্রয়োজনগুলোর চেয়েও সেটা বেশি কিছু।

ঘরের আর কোনো কাজ রব্বোকে করতে হতো না। সে সারাদিন স্রেফখাটের ওপর বসে কখনো বেগম জানের পা, কখনো মাথা, কখনো শরীরের অন্য কোনো অংশ মালিশ করতো। কখনো কখনো তো আমার মন বলে উঠতো, যখনই দেখো রব্বো কিছু-না-কিছু টিপে বা মালিশ করেই চলেছে।

অন্য কারোর বেলায় জানি না কী হতো? তবে আমার শরীরটাকে কেউ এতোটা টেপাটিপি আর মালিশ করলে সেটা এতোদিনে ক্ষয়ে-গলে শেষ হয়ে যেতো। তাও আবার রোজ রোজ এতোটা মালিশও যথেষ্ট ছিলো না। যেদিন বেগম জান গোসল করতেন, ইয়া আল্লাহ্! ব্যাস, দু ঘন্টা আগে থেকেই শুরু হয়ে যেতো নানাপ্রকারের সুগন্ধী তেল আর উবটান দিয়ে মালিশ। আর রব্বো এমন জোরেশোরে তাঁকে মালিশ করতো যে, ব্যাপারটা ভাবলেও আমার নিজেকে অসুস্থ মনে হয়। কামরার দরজা বন্ধ করে দেয়া হতো, মালসায় গনগনে কয়লা রাখা হতো, আর তারপর মহাসমারোহে শুরু হয়ে যেতো মালিশ পর্ব। আমার একদম অসহ্য লাগতো, এই কামরার দরজা বন্ধ করে ঘন্টার পর ঘন্টা টেপাটেপি আর মালিশের ঘটাটা। আমার নিজের কথা বলতে গেলে, কেউ যদি সারাক্ষণ এভাবে আমার শরীরটা ডলাডলি করতো, আমি পচে মরেই যেতাম। কামরার ভেতরে বেগম জানের সঙ্গে শুধু রব্বোই থাকতো। বাকি চাকরানিরা বন্ধ দরজার বাইরে দাঁড়িয়ে গজগজ করতো আর দরকারমতো জিনিসপত্র এগিয়ে দিতো।


আসলে কিনা, বেগম জানের ছিলো বারোমেসে চুলকোনির ব্যারাম। বেচারির শরীরে এমন চুলকোনি ছিলো যে, হাজারটা তেল আর উবটান মালিশ করেও সে-চুলকোনি সারানো যায় নি। ডাক্তার-হাকিমরা বলতেন, “রোগবালাই কিছুই হয় নি, ত্বক পুরোপুরি পরিষ্কার। হ্যাঁ, তবে ত্বকের নিচে কোনো ব্যারাম লুকোনো থাকতে পারে।” “এই ডাক্তারগুলো স্রেফ পাগল! কেউ আপনার সঙ্গে দুশমনি করতে চাইছে নাকি? আল্লাহর ইচ্ছায়, এটা স্রেফ রক্তের গর্মি!বেগম জানের দিকে স্বপ্নালু চোখে তাকিয়ে থাকতে থাকতে রব্বো হেসে হেসে বলতো।

আর এই রব্বো! বেগম জান যতোটা ফর্সা ছিলো, সে অতোটাই কালো। বেগম জান যতোটা সাদাটে ছিলেন, রব্বো ততোটাই লালচে, যেন গরম করা লোহা। মুখে হালকা হালকা বসন্তের দাগ, বেঁটেখাটো গাঁট্টাগোট্টা শরীর, ছোট ছোট চটপটে হাত, আঁটসাঁট ছোট্ট ভুঁড়ি, বড় বড় ফোলা ফোলা ঠোঁট যা সবসময় লালায় ভিজে থাকে, এবং তার শরীর থেকে অদ্ভুত অপ্রীতিকর এক ঝাঁঝালো গন্ধ বেরুতো। আর ওই ছোট ছোট ফোলা ফোলা হাত দুটো কী যে ক্ষিপ্র ছিলো! এই সেগুলো কোমরে, তো এই উরুতে, আবার পরক্ষণেই তড়াক করে গোড়ালিতে! আমি তো যখনই বেগম জানের পাশে বসতাম, দেখতে থাকতাম যে রব্বোর হাতগুলো কোথা থেকে কোথায় যাচ্ছে আর কী করছে।

শীত-গ্রীষ্ম সবসময়েই বেগম জান হায়দরাবাদি জালিকাজের কার্গা কোর্তা পরতেন। গাঢ় রঙের পাজামা আর ঢেউ খেলানো সাদা কোর্তা। ঘরে পাখাও চলতো, আবার তারপরও অবশ্যই একটা পাতলা চাদরে তাঁর শরীর ঢাকা থাকতো। শীতকাল তাঁর খুব পছন্দের ছিলো। শীতে আমারও তাঁর ওখানে বেশ ভালো লাগতো। তিনি নড়াচড়া করতেন খুব কম। গালিচায় শুয়ে শুয়ে শুকনো ফল-মেওয়া চিবোতেন, আর রব্বো বসে বসে তাঁর পিঠ চুলকে দিতোরব্বোকে বাকি সব চাকরানিরা হিংসে করতো। ডাইনিটা বেগম জানের সঙ্গে খায়, ওঠে-বসে, আর মাশাল্লাহ্! একসাথে শোয়ও! রব্বো আর বেগম জানের মুখরোচক সব কাহিনী ছিলো তাদের অবসর সময়গুলোর প্রধান বিনোদন মাধ্যম। কেউ তাদের নাম নিলেই সবাই একসঙ্গে অট্টহাস্যে ফেটে পড়তো। কে জানে, বেচরিদের নিয়ে ওরা কী কী রসালো গল্প ফাঁদতো, কিন্তু বেগম জান সেগুলো কানেই তুলতেন না। তিনি তো শুধু নিজেকে আর নিজের চুলকুনিকে নিয়েই ছিলেন!

আগেই বলেছি, সে-সময় আমি নিতান্ত ছোট এবং বেগম জানের অনুরক্ত ছিলাম। উনিও আমাকে খুব স্নেহ করতেন। ইত্যবসরে আম্মা আগ্রা গেলেন। তাঁর জানা ছিলো যে, একলা ঘরে থাকলে ভাইদের সাথে মারামারি হবে, এখানে-সেখানে ঘোরাফেরা করবো, তাই হপ্তাখানেকের জন্যে আমাকে বেগম জানের কাছে রেখে গেলেন। আমিও খুশি, বেগম জানও খুশি। যতোই হোক, উনি আম্মার পাতানো বোন।

প্রশ্ন উঠলো, আমি শোবো কোথায়? স্বভাবতই, বেগম জানের কামরাতেই। আমার জন্যে তাঁর পালংকের লাগোয়া একটা ছোট চৌকি পেতে দেয়া হলো। রাত দশটা-এগারটা পর্যন্ত আমি আর বেগম জান কথা বললাম আর চান্সখেললাম। তারপর আমি শোয়ার জন্যে আমার চৌকিতে চলে গেলাম। আর যখন আমি শুয়ে পড়লাম, তখনও রব্বো বসে বসে তাঁর পিঠ চুলকে দিচ্ছিলো। কুট্টিন মেয়েছেলে কোথাকার!আমি ভাবলাম। রাতে একবার ঘুম ভেঙে গিয়ে চোখ খুললে আমার কেমন যেন অদ্ভুত রকমের ভয় হতে লাগলো। কামরার মধ্যে ঘোর অন্ধকার। আর সে-আঁধারে বেগম জানের লেপ এমনভাবে দুলছিলো, যেন তার ভেতরে হাতির লড়াই চলছে!

বেগম জান!ভয়ার্ত স্বরে আমি ডাকলাম। হাতির লড়াই বন্ধ হয়ে গেলো। লেপ নিচে নেমে এলো।
কী হলো? ঘুমিয়ে পড়ো।
কোথা থেকে বেগম জানের গলার আওয়াজ ভেসে এলো।
ভয় করছে।

ইঁদুরের মতো চিঁ চিঁ করে আমি বললাম।
 

জ্যোৎস্নায় জোনাকি : অরূপা পতঙ্গিয়া কলিতা (অনুবাদ গল্প)

জোনাকির গ্রামে আজ পর্যন্ত বাসের রাস্তা তৈরি হয়নি। কোথাও যেতে হলে বেশ খানিকটা হেটে বড় রাস্তায় এসে বাসের জন্যে গাছের তলায় দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করতে হয়। ধুলো ও বর্ষার কাদামাখা পা খানা বট গাছের তলায় চাপা কলের জলে ধুতে ধুতে বার বার ঘাড় উঁচু করে দেখতে হয় জোনালি নামে গুয়াহাটি যাওয়ার বাসটা আসছে কি না ! কোন কারনে জোনালি এসে না পৌঁছালে ম্লানমুখে বাড়ি ফিরে যেতে হয়। বাসে বসার কথা কেউ ভাবে না। হাঁস-মুরগি,শুকনো মাছ,মাগুর-কই মাছের টিন, শুকনো পাটের দম বন্ধ করা বাসে দাঁড়াতে পারাটাই পরম সৌভাগ্যের বিষয়। অবশ্য বিশেষ কাজ না থাকলে কেউ ই গ্রামের বাইরে যাওয়ার কথা চিন্তাও করে না।
জোনাকিও গ্রাম থেকে কোথাও যাবার কথা ভাবে না। ওর মা মারা গেছেন। বাবার থাকা না থাকা একই কথা। হাঁপানিতে জাবড়ে ফেলা মানুষটা সিড়িতে বসে থাকে ও হাপরের মত শ্বাস ফেলে। দাদার তিনটি ছেলে মেয়ে। জোনাকির পর ভাইবোন চারটি,বাড়ির উপার্জন বলতে তো ঐ এক টুকরোএক ফসলি জমি। ছাগল, হাঁস, মুরগি, মাঠদেখাশোনা করতে করতে ও ভুলে গেছে যে সে একটি পুর্ণ যুবতী হতে চলেছে। ওর আঁটো সাঁটো শরীরে ভরা বর্ষার উজান। চাঁপা রং-এ ঔজ্জ্বল্য এসেছে। জোনাকিদের গ্রামের রাস্তায় ধুলোতে বা কাদায় ভোটের সময় চাকার দাগ পড়ে। এবার কিন্তু ভোটের দামামা বাজতেই একদিন দুপুরে হুম হুম করে ছ খানা মিলিটারি ট্রাক ঢুকে পড়ল গ্রামে। ঠায় তিনদিন দাড়িয়ে রইল তারা গ্রাম আলো করে। গাড়িগুলো উগরে দিল একঝাক মিলিটারি সৈন্য। তাঁবু খাটিয়ে ওরা দিব্য সংসার পাতল। সারা দিনরাত জুতোর খট খট আওয়াজ তুলে গ্রাম পাহারা দেয়া চলল।
সেদিন জোনাকি রাতে খাবার জন্য ঢেঁকি শাক তুলতে বাড়ির পেছনে কলা বাগান ছাড়িয়ে পুব দিকের জঙ্গলে গিয়ে ঢুকেছিল। চাল কম, কোন সব্জিও নেই কী দিয়ে সকলের পাতে ভাত দেবে? একবার খাওয়া শেষ হলেই আর একবারের চিন্তা। শাকগুলো খুঁটে খুঁটে তুলে আনছিল। শাক খুঁজতে খুঁজতে অনেকদূর চলে গিয়েছিল সে। এতগুলো হাঁ মুখ জোগান দিতে হবে তো? বেশ অন্ধকার হয়ে এসেছে, দ্রুত পা চালাল সে। পেছনে একটি অচেনা আবছা অবয়ব দেখে প্রায় ছুটতে লাগল সে। কিন্তু ওর পা আর কতটা গতি পেতে পারে? ও কিছু বোঝবার আগেই যা ঘটবার ঘটে গেল, মুহূর্তে ওর সতের বছরের কোমল শরীর লুটিয়ে পড়ল অন্ধকার কলা বাগানে। কারোর পায়ের ত্রস্ত শব্দ শুনে শয়তানটি দৌড়ে পালিয়ে গেল। আর মাটির ঘাসকে খামচে ধরে নিশ্চল বসে রইল জোনাকি। নিকষ কাল অন্ধকার, মাথার ওপর শা শা করে উড়ে গেল বাদুড়,শেয়াল কঁকিয়ে উঠল পেঁচার কর্কশ স্বরে কেঁপে উঠল বিশ্ব চরাচর।
বড়দাদা আরও কিছু মানুষকে সঙ্গে নিয়ে বোনকে খুজতে খুঁজতে সেখানে উপস্থিত হয়ে নিশ্চল পাথর প্রতিমার দিকে তাকিয় রইল অবাক হয়ে। সঙ্গের লোকজনের পায়ে পড়ে দাদা বলল –’এই কথা যেন কিছুতেই পাঁচ কান না হয়।
দাদা যতই বলুক, আর যতই মানুষের পায়ে পড়ুক, খবর আগুনের মত ছড়িয়ে পড়ল গোটা গ্রামে। ঘরে ঘরে ফিস্ ফিস্। বউ-ঝিদের ঘর থেকে বেরনো বন্ধ হল। দাদা-বউদির শাপ শাপান্ত অতিষ্ঠ করে তুলল জোনাকির জীবন। ভাই-বোন, ভাইঝি-ভাইপোরা দূর থেকে ওকে দেখে সরে যায়।
সেদিন হঠাৎ- ই ওর কাছে এসে দাঁড়াল বড়দাদা, ‘এক কাপ চা দিবি রে।কৌটোয় এক ফোঁটাও চা-পাতা নেই। সকালবেলায় ফোটান চা-পাতার ওপরে জল ঢেলে দাদাকে চা করে দিল, চিৎকার করে উঠল দাদা—’এটা কী দিয়েছিস?’ পাগলের মত চিৎকার করে এক ঘা বসিয়ে দিল জোনাকির পিঠে। কঁকিয়ে উঠল সে, ‘বনে জঙ্গলে গিয়ে মরেছিলি কী করতে?’ দিনে রাতে এই শাপ শাপান্ত ওর বুকে পিঠে কালশিটে দাগ এঁকে দিচ্ছিল। হঠাৎ সদর দরজায় খট খট শব্দে শুনে চোখ তুলে তাকিয়ে দেখল মহাজন বাড়িতে ঢুকছে।
সমস্ত গ্রামের মধ্যে সবচেয়ে অর্থবান ব্যক্তি হল মহাজন। গ্রামে একটি বড় দোকান, তাতে সুঁচ থেকে তাঁতের সাজ-সরঞ্জাম সব কিছুই পাওয়া যায়। শহরেও দুটো দোকান আছে। পরিবার-পরিজন শহরেই থাকে, গ্রামের বাড়িতে ধান বপন করার সময় কিছুদিন এসে থাকে। এইরকম একটি লোক বাড়িতে আসায় বাড়িতে আশঙ্কার ছায়া পড়ল। কেন এসেছে মহাজন? এই প্রশ্ন সকলের মনে ঘুরতে লাগল ! কী কারণে এল ?
মহাজন এসে চাতালে বসল। গৌরচন্দ্রিকা না করেই সে বলল, ‘…তোর বোনের কথা শহরের যে জায়গাগুলোতে জানানো দরকার সব জায়গাতেই জানিয়েছি।
ভেতরে জোনাকি ও বড়-বউ,বাইরে উঠানে মহাজনের পায়ের কাছে বসে থাকা দাদা চম্কে উঠল এই কথা শুনে। হাত জোড় করে দাদা বলল, ‘মহাজন, যা হয়েছে হয়েছে। গলা পচা ঘা আর খুঁটবেন না। মেয়েমানুষ। ভগবান জানে ওর কপালে কী আছে!
মহাজন স্বভাবসুলভ ভঙ্গিতে বড়দাদার কাছে এসে ফিশ ফিশ করে বলল, ‘কী আকাটের মত কথা বলিস? সরকারের কাছে দরবার করা হয়েছে। জানানো হয়েছে।
বস, বস, তুই এত বুঝবি না। শুধু এটুকু জেনে রাখ, শহরের বড় বড় লোকেরা তোর বোনের অপমান নিজের অপমান বলে মনে করছে।
- ‘না, না, এরকম করবেন না। কথাটা এখন গ্রামের মানুষের মধ্যে আছে, আর বেশি জানাজানি হলে আমার কপালে কী ঘটবে জানি না।
এবার গঙ্গা মহাজন দাদার পিঠের কুঁজে হাত রেখে। চোখ টিপে বলল, ‘বুঝেছিস, সরকারের কাছ থেকে টাকা পয়সা পাবি। বুঝেছিস তো? ভাল টাকাই আদায় করতে পারবি।যাওয়ার আগে মহাজন দাদার হাতে একশটা টাকা গুঁজে দিয়ে বলল, ‘শহরের থেকে মানুষজন আসবে বসার জন্যে দু-একটা মোড়া, জলচৌকি জোগাড় করে রাখিস।

বড়দাদা দুটো মোড়া পাশের বাড়ি থেকে চেয়ে আনার আগেই সত্যি শহর থেকে দু-তিনটে যুবক এসে হাজির হল বসার জন্য চাতালে পাটি পেতে দিয়ে বড়দাদা বিব্রত হয়ে দাড়িয়ে রইল, হাতজোড় করে। যেন মহা অপরাধী। শান্ত, ভদ্রভাবে কিছু কথা জিজ্ঞেস করার পর ওরা জোনাকিকে ডাকল। ওরা জোনাকির ফটো তুলবে। ঘরের ভেতর জোনাকি কেঁপে উঠল। ছবি তুলবে? গতবার মেলায় গিয়ে কমলা, ভাদৈ, রূপাদের সঙ্গে কথা ছিল ছবি তোলার। কত যত্ন করে হাঁসমুরগি বিক্রির টাকা কটা জমিয়ে রেখে ছিল। বড় ভাইপোটার পেট খারাপ হওয়ায় জমান পয়সা সব কটা বেরিয়ে গিয়েছিল। বড় কষ্ট হয়েছিল ওর। ভাদৈদের কাছে ওদের তোলা ছবি কতবার চেয়ে চেয়ে দেখেছে।
 

ভাংকাঃ আন্তভ চেকভ

নয় বছর বয়সি ভাঙ্কা জুকভ তিনমাস ধরে কাজ শিখছে নামকরা জুতো নির্মাতা আলিয়াহিন এর কাছে। বড়োদিনের আগের রাতে বাড়ির কথা মনে করে ঘুম আসছিলো না তার। দাদুর কাছে চিঠি লেখার জন্যে সুযোগ খুঁজছিলো সে। মালিক, মালিকের বউ এবং কর্মচারীরা গির্জায় চলে যেতেই ভাঙকা মালিকের আলমারি থেকে কালির দোয়াত, মরচে ধরা নিবঅলা কলম আর দোমড়ানো মোচড়ানো একটা কাগজ নিয়ে লিখতে বসলো।

লেখা শুরু করার আগে বেশ কয়েকবার ভীত-চকিত দৃষ্টিতে জানালা, দরোজা এবং নিজের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো সে। ছোটো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে রাখা বেঞ্চটার ওপর কাগজটা বিছিয়ে হাঁটু গেড়ে বেঞ্চের ওপর ঝুঁকে লিখতে শুরু করলো।

‘প্রিয় দাদু, বড়োদিনের শুভেচ্ছা জানবেন। প্রভু যিশুর জন্মদিনে মহান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আপনাকে দীর্ঘায়ু করেন। আপনি ছাড়াতো আমার আর কেউ নেই, ঈশ্বর আমার মা-বাবা দুজনকেই কেড়ে নিয়েছেন, আমার সবকিছুইতো আপনি।”

এ পর্যন্ত লিখে ভাঙকা থেমে পড়লো। দাদুর কথা বড়ো বেশি মনে পড়ে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বুকটা হু হু করে উঠলো তার। মানসপটে স্পষ্ট সে দেখতে পেল তার দাদুর কর্মকান্ড।

ভাঙকার দাদু কন্সতান্তিন মেকারিচ নৈশপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন এক বাড়িতে। পঁয়ষট্টি বছর বয়সি নেশালু চোখের অধিকারী মেকারিচ হালকা-পাতলা শরীরের একজন শক্তসমর্থ, সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষ।
দিনের বেলা মেকারিচ চাকরদের রান্নাঘরে ঘুমান অথবা বাবুর্চির সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটান। রাতের বেলা ভেড়ার চামড়ার তৈরি একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বাড়ির চারপাশে টহল দিয়ে বেড়ান, আর ছোটো কাঠের হাতুড়ি ‘ম্যালেট’ দিয়ে হাতের তেলোতে বাড়ি মেরে মৃদু কিন্তু স্পষ্ট শব্দ করেন, যাতে বাড়ির মালিক বুঝতে পারেন যে, তিনি কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন না এবং চোর-ছ্যাঁচোড়েরা কেউ একজন পাহারায় আছে এই ভেবে কাছে ঘেঁষার সাহস না পায়।

এইসময় তার পোষা দুই কুকুর কাশতাঙকা আর ঈল তাকে অনুসরণ করে। ঈলের গায়ের রঙ কালো, বেজির মতো শরীর। অতিশয় বিনয়ী এবং আদুরে স্বভাবের ঈল কাউকে খারাপ চোখে দেখে না, নিজের মুনিবের মতোই ভদ্র ব্যবহার করে সে আগন্তুকদের সাথেও। কিন্তু তার এই আপাত ভদ্রতার আড়ালে যে একটা বদমাশ লুকিয়ে আছে সেটা আশপাশের লোকজনই শুধু জানে। কারো ভাঁড়ারে ঢুকে খাবার চুরি করা কিংবা গ্রামের কৃষকের বাড়ি থেকে মুরগি চুরি করাতে তার জুড়ি নেই। আর এ কারণে তাকে কতোবার যে পিটিয়ে আধমরা করা হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তারপরও তার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি।

এই মুহূর্তে কোনো সন্দেহ নেই তার দাদু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গির্জার লাল জানালাগুলোর ওপর চোখ বোলাচ্ছেন। ভারী বুটের খটখট আওয়াজ তুলে চাকর চাকরানিদের সাথে মজা করছেন। ছোট্ট ম্যালেটটা তার কোমরে বেল্টে ঝোলানো। হাতে হাত ঘষে মেকারিচ ঠান্ডা তাড়াবার চেষ্টা করছেন, আর ফাঁকে ফাঁকে বাবুর্চি কিংবা কোনো চাকরানির পেটে গুঁতো মারছেন দুষ্টুমি করে।

‘নস্যি চলবে?’ চাকরানির উদ্দেশে জিজ্ঞাসা তাঁর। মহিলা হাত বাড়িয়ে একচিমটি তামাকের গুঁড়ো নিয়ে নাকে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। খুশিতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন মেকারিচ। বললেন, ‘সর্দির জন্যে খাসা জিনিস কিন্তু!’

তারা মজা করার জন্যে কাশতাঙকার নাকেও শুঁকালেন, শ্বাস টেনেই চমকে উঠলো কাশতাঙকা। অস্থিরভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে বাইরে চলে গেল কুকুরটা। সঙ্গিনীর করুণ অবস্থা দেখে নস্যি নেওয়ায় অসম্মতি জানালো ঈল, কিন্তু তার লোকদেখানো বিনয়ী স্বভাবের কারণে লেজ নাড়াতে শুরু করলো মাথা নিচু করে।

চমৎকার আবহাওয়া। পরিষ্কার তাজা বাতাস বইছে চারিদিকে। দৃষ্টিগ্রাহ্য অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো গ্রাম। তুষারে ঢাকা গ্রামের বাড়িগুলোর শাদা ছাদ জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারেও; আর চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা কুন্ডলি পাকানো ধোঁয়া সহজেই নজর কাড়ে।
গাছগুলো ঢেকে আছে শ্বেত-শুভ্র তুষারে। আকাশে ঝিলমিল করছে তারকারাজি। সারা আকাশ যেন কিসের আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে। পুরো ব্রহ্মান্ড মনে হয় স্নান করে নিজেকে পুত-পবিত্র করে নিয়েছে বড়োদিনের খুশিতে।বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভাঙকার। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে আবার।
“গতকাল মালিক আমাকে খুব গালাগালি আর মারধোর করেছে। আমার চুলের মুঠি ধরে উঠোনে বের করে দিয়েছে। ভীষণ মেরেছে জুতো রাখার স্ট্রেচার দিয়ে, কারণ আমি তাদের বাচ্চাটাকে দোলনায় দোল দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গত সপ্তাহে মালিকের বউ আমাকে হেরিং মাছ পরিষ্কার করতে বলেছিলো, আমি মাছের লেজের দিক থেকে কাটা শুরু করেছিলাম বলে বেগম সাহেবা এসে মাছগুলো আমার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে। অন্য কর্মচারিগুলো সবসময় তামাশা করে আমাকে নিয়ে। প্রায়ই তারা আমাকে ভদকা আনতে পাঠায় শুঁড়িখানায়। কখনো বাধ্য করে মালিকের ঘর থেকে শশা চুরি করে আনার জন্যে, আর মালিক একথা জানতে পেরে হাতের কাছে যা পায় তা-ই দিয়ে মারতে শুরু করে।
বেশি কষ্ট পাই খাবার নিয়ে, একদিনও পেট ভরে খেতে পারি নি এখানে,দাদু। সকালে সামান্য রুটি, দুপুরে খিচুড়ি আর রাতে আবার সেই রুটি। চা কিংবা স্যুপ কখনো কপালে জোটে না, মালিক আর তার বউই সব খেয়ে শেষ করে। রাতের বেলা শুতে দেয় বারান্দায় চলার পথে। তাদের বাচ্চাটা যখন কেঁদে ওঠে তখন আমার ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ, বাচ্চাটাকে দোলনা দিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে অনেক সময় লেগে যায়।

প্রিয় দাদু, প্রভু যিশুর দোহাই লাগে, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। নতমস্তকে আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি দাদু, আমাকে নিয়ে যান, নইলে আমি মরে যাবো।
বিড়বিড় করে কথা বলছে ভাঙকা। দুচোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। শীর্ণকায় দুই হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে লিখে যাচ্ছে।

‘আমি আপনার তামাক সাজিয়ে দেবো, দাদু। ঈশ্বরের কাছে আপনার জন্যে প্রার্থনা করবো। যদি কোনো ভুল করি আপনার যেভাবে খুশি আমাকে শাস্তি দেবেন দাদু। রোজগারের জন্যে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, দরকার হলে আমি নায়েবের জুতো পরিষ্কার করবো। নয়তো মেষপালকের চাকরি নেবো।
প্রিয় দাদু, আমি আর সহ্য করতে পারছি না, এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি অনেকবার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার জুতো নেই বলে পারি নি। বাইরে এতো বেশি বরফ যে, খালি পায়ে কিছুদূর গেলেই পা জমে যাবে। সেই ভয়ে যেতে পারি নি।
‘প্রিয় দাদু, আমি যখন বড়ো হবো তখন আপনার দেখাশোনা করবো। আপনার যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবো। আর আপনি যদি কখনো মারা যান আমি আপনার আত্মার শান্তির উদ্দেশে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো, যেভাবে আমি আমার মায়ের জন্যে সবসময় করি।

‘মস্কো খুব বড়ো শহর। শিক্ষিত, ভদ্রশ্রেণির লোকদের বসবাস এখানে। প্রচুর ঘোড়া আছে এই শহরে, কিন্তু কোনো ভেড়া নেই। আর এই শহরের কুকুরগুলো কিন্তু মোটেও হিংস্র নয়। এখানকার তরুণরা বড়োদিনে কখনো তারকা হাতে দুয়ারে দুয়ারে গান করতে যায় না। একদিন একটা দোকানে দেখলাম মাছ ধরার ছিপ-বড়শি রাখা হয়েছে বিক্রি করার উদ্দেশে। প্রায় সবধরণের মাছ ধরার জন্যে তৈরি করে সুতো-বড়শি সমেত। সবচেয়ে মজবুত ছিপ যেটা ছিলো সেটা দিয়ে অনায়াসে চল্লিশ পাউন্ড ওজনের যে-কোনো মাছ তুলে আনা যাবে।

 
 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।