লুড মুসুলির দ্রুতগামী ক্যালিকো ঘোড়াটি আমি
চুরি করিনি যদিও চারপাশে প্রচার করা হচ্ছে আমিই চুরি করেছি। যারা আমাকে জানে তারা
কখনোই বিশ্বাস করবেনা যে, এ ধরনের একটি কাজ আমি করতে পারি। মি. জন
টার্নারকে আমি প্রধান সাক্ষী মানছি, আপনারা
তাকেই জিজ্ঞেস করুন। সেই বাল্যকাল থেকে তিনি আমাকে জানেন। বিশ্বাস করুন, ঘোড়া চোর হওয়ার জন্য আমি বড় হইনি। গত পরশু রাতের কথা, এক জায়গায় যাব স্থির করে মনের কথাটা মিঃ টার্নারের কাছে
প্রকাশ করি। গত দুবছর ধরেই ছুটির দিনগুলো আমি ইচ্ছেমত ঘুরে বেড়িয়েছি।বরাবরই
উৎফুল্লচিত্তে তিনি আমাকে বিদায় জানিয়েছেন। ঘোড়া, গদি দিয়ে
আমার ভ্রমণকে সুখময় করেছেন। আমার প্রস্তাব শুনে তিনি খুশি হলেন, কাজের অবসরে বেড়ানোটাকে তিনি যথেষ্ট মূল্য দিয়ে থাকেন।
বললেন, বেশ তো যাও। বেটসিকে (বেটসি একটি মাদি
ঘোড়ার নাম) নিয়ে যেও। ও আমার মতো তোমার সফরকেও আনন্দময় করে তুলবে। ও হ্যাঁ, ‘টেকসাস সেডেল’ গদিটাও
নিয়ে যেও।
তাঁর এই দিলখোলা আচরণ আমার খুবই ভাল লাগে। হেসে
জবাব দেই, না গদিটদির আমার দরকার নেই, চাবুক আর লাগামটা হলেই চলবে। এতেই আমি স্বচ্ছন্দবোধ করব।
তাছাড়া আমি যেখানে যাচ্ছি ওখানে যাওয়ার জন্য ‘টেকসাস
সেডেল’ এর মতো মূল্যবান গদির প্রয়োজন পড়ে না।
এ সফর আমার একান্তই ব্যক্তিগত। পথে আমাকে ডেকে থামানোর অধিকারও কারো নেই।
মিঃ টার্নার বলবেন-অবশ্যই বলবেন কোনো সমস্যায়
জড়িয়ে পড়ার জন্য সে রাতে আমি ঘর থেকে বেরিয়ে যাইনি। তিনি আমার সারাজীবনের খবর
রাখেন। অতীতে তাঁকে কিংবা অন্য কাউকে কখনো আমি বিপদে ফেলিনি।
আমি যখন বেটসিকে নিয়ে মি. টার্নারের আস্তাবল
ত্যাগ করি রাতের খাবারের সময় তখন অতিক্রান্ত। মি. টার্নার উঠোনে এসে দাঁড়ালেন
এবং আবারও জিজ্ঞেস করলেন যে, গদি আমি নিতে চাই
কি-না। ঘোড়ার পিঠে সামান্য কুঁজো। আমি সেটাকে গুরুত্ব দিলাম না। বললাম, খালি পিঠে চড়তে আমার খারাপ লাগে না। তিনি তখন সহাস্যে
বললেন, ঠিক আছে তোমার যেমন ইচ্ছে। তিনি আমাকে
কিছুটা পথ এগিয়ে দিলেন, ঘোড়া ছোটানোর আগ পর্যন্ত তিনি বেটসির
গলা ধরে দাঁড়িয়ে রইলেন এবং কৌশলে জানতে চেষ্টা করলেন কোথায় যাচ্ছি- যদিও তিনি
তা আগে থেকেই জানতেন। আমার মনে হলো বিদায়বেলায় তিনি ঠাট্টা করে কিছু একটা বলতে
চেয়েও বললেন না- আমি যাওয়া স্থগিত করতে পারি এই ভেবে। গেট পেরিয়ে রাস্তায়
নেমে এলাম এবং অল্পক্ষণের মধ্যেই বিশপের ক্রসরোড অতিক্রম করে ফেললাম। অন্ধকার ছিল, তবু একবার পেছনে ফিরে দেখলাম উঠোনের গেটে দাঁড়িয়ে মি.
টার্নার একদৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। নতুন রাস্তায় পড়ে বেটসি ধীরে ধীরে
এগোতে থাকে। প্রতিদিনের মতো আজ আর তাড়াহুড়ো করলাম না। কারণ পরিশ্রান্ত ছিলাম।
তাছাড়া তিন কিলোমিটার পথে নষ্ট করার মতো দুঘন্টা সময় আমার হাতে ছিল।
লুড মুসুলির কনিষ্ঠ কন্যা নাওমির সঙ্গে আমি
দেখা করতে যাচ্ছি, পথ পাশের যারা আমাকে চিনত তারা সবাই তা
জানত। নাওমি অপূর্ব সুন্দরী মহৎ হৃদয়ের একটি মেয়ে। তার সঙ্গে আমার বেশ কদিন দেখা
হয়নি। তাই সে বলেছিল, যে কোনো উপায়ে যেতে। বলেছিল, উঠোনের গাছগুলোর নিচে অন্ধকারে দাঁড়িয়ে আমার জন্য অপেক্ষা
করো।
পৃথিবীতে আমার এমন কোনো সম্পদ কিংবা
প্রভাব-প্রতিপত্তি নেই, যা নিয়ে আমি মি. মুসুলির বিরুদ্ধে দাঁড়াতে
পারি। অতি মামুলি একজন মানুষ আমি। কিন্তু নাওমির জন্য আমার ভালবাসা মামুলি নয়।
এখন মি. টার্নারই আমার একমাত্র ভরসা। দুর্দিনে তিনি আমার পাশে দাঁড়াবেন, এ বিশ্বাস আমার আছে। একটা মাত্র সপ্তাহ আমি নাওমিকে দেখতে
পাইনি। ওটা তেমন কি আর দীর্ঘ সময়। তবু নাওমির ওপর আমার ভীষণ রাগ হচ্ছে। মনে হচ্ছে
ও আমাকে ভালবাসে না কিংবা কখনোই বলেনি গিয়ে দেখা করতে। তাহলে নিশ্চয়ই তার বাবা
আমাকে বাড়ির গেট থেকে বিদায় করে দিতে পারতেন না। বলতে পারতেন না, তোমার আসবার প্রয়োজন নেই।
মি. মুসুলি মনে করেন নাওমির সঙ্গে আরেকবার দেখা
হলেই আমরা পালিয়ে বিয়ে করার সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলব। তখন আর তিনি আমাদের ধরার
সুযোগ পাবেন না। তাই তিনি একটু মাত্র ভুলের জন্য আমাকে তার ঘোড়া চুরির অপবাদ
দিয়ে বিশ বছরের জন্য মানব সংশোধনী জেলে পাঠিয়ে দেয়ার সুযোগ নিচ্ছেন। তিনি নিজেও
জানেন-চুরি যে আমি করিনি। তবু এইত সুযোগ পথের কাঁটা সরিয়ে দেয়ার। তিনি মনে করেন, অপদার্থটাকে কোনো রকমে জেলে ঢুকিয়ে দিতে পারলেই নাওমির
অন্যত্র বিয়ে দেয়ার পক্ষে আর কোনো বাধাই থাকবে না।
গত পরশু বৃহস্পতিবার রাতে বেটসির খালি পিঠে
চড়ে আমি যখন নাওমিদের বাড়ির কাছে যাই, রাত তখন
নটা। বাড়ি ও তার চারপাশের সবকিছুই তখন শান্ত এবং স্বাভাবিক। ওটা লুড মুসুলির শুতে
যাওয়ার সময়। আমি গোলাবাড়ির উঠোনের গেটে গেলাম। সেখান থেকে নাওমির ঘরের বাতি
দেখা যাচ্ছিল। ওই ঘরে সে আর তার বড় বোন মেরি লি থাকে। আমরা সব সময় লি’র নটা ত্রিশে ঘুমোতে যাওয়ার পরই মিলিত হতাম। জানালা দিয়ে
উঁকি দেই। দেখি নাওমি শুয়ে আছে। আর তার শয্যাপাশে দাঁড়িয়ে তার বোন মেরি লি কিছু
একটা বিষয়ে কথা বলছে। কিন্তু হঠাৎ দেখি মেরি লি নাওমির শরীর থেকে পোশাক খুলে নিতে
চেষ্টা করছে। হয়ত রাতে যাতে বের হতে না পারে সে জন্যই এ ব্যবস্থা। আমার খুব খারাপ
লাগছিল। কারণ, এরপর নাওমিকে আবার অন্ধকারে লুকিয়ে
পোশাক পরে আমার কাছে আসতে হবে। আমার মনে হয়, মেরি লি’র সঙ্গে চালাকি না করে সব কথা তাকে খুলে বললেই ভাল হতো।
তাহলে সে হয়ত আমাদের সহায়তা করত। কিন্তু নাওমি কিছুতেই রাজি হয় নি। বলাটাকে সে
ঝুঁকিপূর্ণ বলে মনে করেছে। কিন্তু মেরি লি তার সব চালাকি বুঝতে পারত। তাই সে সুযোগ
খুঁজছিল আমাদের জব্দ করার জন্য। আমার উপস্থিতি আঁচ করতে পেরেই সে ঘুমোতে যাওয়ার
ছলে তার বাবাকে গিয়ে বলল। নাওমিও অল্পক্ষণের মধ্যেই বোনের চালাকি বুঝতে পারে এবং
বিছানা থেকে উঠে নিজেই পোশাক খুলে ফেলল। আমি কিছুই জানতে পারিনি। গাছগুলোর নিচে
অপেক্ষা করতে থাকি। পনেরো মিনিটের মতো সময় কেটে যায়। ‘বোনের চোখকে ফাঁকি দিয়ে নাওমি কিভাবে বেরিয়ে আসে’ তাই দেখতে বড় ইচ্ছে করছিল।
আর তখনই হঠাৎ মুসুলির ঘরের জানালা খুলে গেল।
আমি নিজেকে আড়াল করতে নিরাপদ দূরত্বে গিয়ে অপেক্ষা করতে থাকি। এভাবেই অপেক্ষায়
থেকে থেকে রাত গড়িয়ে যায়। আর নাওমির আসার সম্ভাবনা ক্রমশই ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর
হয়ে যায়। বাড়ি ফিরব বলে স্থির করি। রাত তখন সাড়ে বারোটা কি একটা। চাঁদ মেঘের
আড়ালে ঢাকা পড়ে গেছে। অন্ধকারে আচ্ছন্ন হয়ে গেছে মুসুলির গোলাবাড়ির উঠোন।
সামনে আমি আমার নিজের হাতই দেখতে পাচ্ছি না। বেটসিকে বের করে আনতে গেলাম। গিয়ে
দেখি আস্তাবলের দরজা খোলা। অন্ধকার হাতড়ে বেটসিকে খুঁজতে থাকি, আস্তাবলের এক কোণে তার পশ্চাৎপাশে আমার হাত পড়ল। কিন্তু
মুখে তার লাগাম নেই। ভাবলাম, লাগাম হয়ত খুলে
ফেলেছে। মাটিতে পায়ের সাহায্যে অনেক খোঁজাখুঁজি করেও পেলাম না। দরজার কাছে মি.
মুসুলির ঝুলিয়ে রাখা একটা লাগাম পেয়ে গেলাম। সেটা লাগিয়েই বেটসিকে নিয়ে
রাস্তায় নেমে এলাম এবং কিছুক্ষণের মধ্যেই মুসুলির এলাকা পার হয়ে এলাম। বাড়ি
পৌঁছে বেটসিকে আস্তাবলে বেঁধে রেখে যখন শুতে গেলাম রাত তখন প্রায় শেষ হয়ে গেছে।