দেশ ভাগ হলো। আর আহত হলো অগণিত লোক। সকলে উঠে
শরীর থেকে রক্ত মুছে ফেলে। আর সকলে মিলে একজনের দিকে ছুটে যায়, যার দেহে কোনো আঘাতের চিহ্ন নেই, কিন্তু হৃদয় আহত। মহল্লা মহল্লায় গলিতে গলিতে ‘আবার পূনর্বাসন’ সম্পর্কিত
কমিটি গঠিত হয়েছে। প্রথম দিকে অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে ব্যবসা বাণিজ্যে
পূনর্বাসন, জমিতে পুনর্বাসন, আর বাড়ি ঘরে পুনর্বাসন কর্মসূচি শুরু করা হয়। তবে একটি
কর্মসূচি ছিল যার প্রতি কারও তেমন মনযোগ ছিলনা। তা হলো অপহৃত মহিলাদের উদ্ধার
কর্মসূচি। এর স্লোগান ছিল ‘হৃদয়ে পুনর্বাসন’। কিন্তু এই কর্মসূচির ব্যাপারে নারায়ন বাওয়ার মন্দির এবং আশে পাশে বসবাসকারী
প্রাচীনপন্থী গোত্রের লোকজন প্রচ- বিরোধিতা করে।
এই কর্মসূচি বাস্তবায়নের জন্য মন্দিরের পাশের
মহল্লা ‘মোল্লা শুকুর’ এ একটি কমিটি গঠিত হয়। এগারো ভোটে সুন্দর লাল বাবুকে
সম্পাদক এবং উকিল সাহেবকে সভাপতি মনোনীত করা হয়। কালান থানার বৃদ্ধ কেরানী এবং
মহল্লার অন্যান্য মাতব্বর লোকদের ধারণা, সুন্দর
লাল ছাড়া এই দায়িত্ব অত্যন্ত আন্তরিকতার সাথে অন্য কেউ সম্পাদন করতে পারবেনা। কারণ
সুন্দর লালের স্ত্রী অপহৃত হয়েছে আর তার নাম ছিল লাজবন্তি। অতএব, প্রভাত ফেরীর মিছিলে সুন্দর লাল, তার বন্ধু রেসালো এবং নেকীরাম ও অন্যান্যরা মিলে যখন গাইতে
থাকে ‘হাত লাই কমানী লাজওয়ান্তি দে বুটে’ (অর্থাৎ এটি একটি লজ্জাবতী লতার চারা, হাত লাগালেই সংকুচিত হয়।) তখন সুন্দর লালের মুখ দিয়ে কোনো
আওয়াজ বের হয় না। সে নীরবে মিছিলে সবার সাথে এগিয়ে যেতে যেতে লাজবন্তির ব্যাপারে
ভাবতে থাকে, ‘জানি না সে কোথায় কি অবস্থায় আছে। আমার
ব্যাপারে কি ভাবছে। সে কি কখনও ফেরত আসবে নাকি আসবেনা?’ ইটের রাস্তা দিয়ে হাঁটতে হাঁটতে তার পা নড়বড় করে উঠে।
এখন এমন অবস্থা হয়েছে যে, লাজবন্তি সম্পর্কে চিন্তা ভাবনাই ত্যাগ করেছে। তার দূঃখ
সারা দুনিয়ার বেদনায় পরিণত হয়েছে। সে দুঃখ বেদনা থেকে পরিত্রাণের জন্য জনসেবায়
আত্মনিয়োগ করেছে। অবশ্য এরপরও তার সাথীদের সাথে গানে সুর মিলাতে গিয়ে তার অবশ্যই মনে
হয়, মানুষের হৃদয় কত নাজুক। সামান্য ঘটনায় আঘাত
পায়। সে লজ্জাবতী লতার মতো। ওর দিকে হাত বাড়ালেই সংকোচিত হয়। কিন্তু সে লজ্জাবতীর
সাথে অনেক দুর্ব্যবহার করেছে। সে তার চলাফেরা, খাবার
ব্যাপারে অমনযোগী হওয়া এবং এ ধরনের মামুলী মামুলী ব্যাপারে তাকে মারধর করত।
আর লাজু শাহতুত (এক প্রকার ফলের গাছ) গাছের
হালকা ডালের মতো নাজুক ফর্সা গ্রাম্য মেয়ে ছিল। রোদে ঘোরাঘুরি করায় তার গায়ের রং
শ্যামলা হয়ে গেছে। তার স্বভাব আচরণে এক বিচিত্র অস্থিরতা ছিল। তার অস্থিরতা শিশির
বিন্দুর মতো যেটা বড়ো পাতায় এদিক সেদিক ছুটাছুটি করে। তার দেহের গড়ন ছিল হালকা
পাতলা যেটা তার দুর্বল স্বাস্থ্যের লক্ষণ নয় বরং সুস্বাস্থ্যের লক্ষণ। তাকে দেখে
প্রথমে ঘাবড়ে যায় সুন্দরলাল। কিন্তু পরে দেখল, লাজু সব
ধরনের বোঝা আর দুঃখ কষ্ট সহ্য করতে পারে। এমনকি মার খাওয়ার পরও যথারীতি সহ্য করে
যাচ্ছে। তখন সুন্দর লাল লাজুর উপর তার নির্যাতনের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। কিন্তু সে
জানত না, এরও একটা সীমা আছে, সীমা অতিক্রম করলে মানুষের ধৈর্য্য ভেঙে যায়। অবশ্য এর জন্য
লাজুরও কিছু ভূমিকা ছিল। সে কখনও উদাস হয়ে বসে থাকতে পারে না। তাই দারুণ ঝগড়া
বিবাদের পরও সুন্দর লাল মুছকি হাসলে লাজু হাসি চেপে রাখতে পারত না আর লাফিয়ে ওর
কাছে চলে আসত। আর গলায় দুহাতে জড়িয়ে বলত, ‘আবার
আমাকে মারলে তোমার সাথে কথা বলব না …।’ এতে সুস্পষ্ট যে, এতক্ষণের মারপিট খাওয়ার ঘটনা সে ভুলে গেছে। গ্রামের
অন্যান্য মেয়েদের মতো সে জানে, পুরুষরা মেয়েদের
সাথে এমনি ব্যবহার করে থাকে। অবশ্য মেয়েদের মাঝে কেউ বিদ্রোহ করলে তখন মেয়েরাই
হতবাক হয়ে বলতে থাকে, ‘দেখ, এ কেমন
পুরুষ, মেয়ে মানুষকে নিয়ন্ত্রণে আনতে পারে না।’ এই মারপিটের ঘটনা তাদের গীতে উচ্চারিত হয়। স্বয়ং লাজু গাইতে
থাকে-
‘আমি শহরের বাবুকে বিয়ে করেব না।
ওরা জুতা পরে আর
আমার নিতম্ব যে অত্যন্ত ছোটো।’
ওরা জুতা পরে আর
আমার নিতম্ব যে অত্যন্ত ছোটো।’
কিন্তু প্রথম দফায় লাজুর শহরের এক ছেলের সাথে
তার হৃদ্যতা গড়ে ওঠে। তার নাম সুন্দর লাল। একটি বরযাত্রীর সাথে সে লজ্জাবতীর
গ্রামে এসেছিল। সে বরের কানে কানে বলেছিল, ‘তোমার
শালী তো বেশ চটপটে, তোমার স্ত্রীও চটপটে হবে।’ লাজবন্তি সুন্দর লালের এই কথা শুনেছিল। কিন্তু সে ভুলেই
গিয়েছিল, সুন্দরলাল কিরূপ কুৎসিত জুতা পরেছিল আর
তার কোমর কতখানি চিকন। প্রভাত ফেরিতে সুন্দর লালের এসব কথা মনে পড়ছে। আর সে ভাবছিল, যদি ‘লাজবন্তির’ আবার সে দেখা পায়, তবে
সত্যিই সত্যিই সে তাকে হৃদয়ে স্থান দেবে আর লোকজনকে বলবে, বেচারী মেয়েদের অপহৃত হওয়ার ব্যাপারে তার কোনো অপরাধ নেই।
যে সমাজে এই সব নিরপরাধ ও নিষ্পাপ মহিলাদের গ্রহণ করে না, তাকে আপন করে নেয় না, সেটা একটি
গলিত পঁচা সমাজ। তাকে নিশ্চিহ্ন করা দরকার। সে এসব অপহৃতা মহিলাদের প্রত্যেক
বাড়িতে পুনর্বাসনের শপথ নেয় আর তাদের এমন মর্যাদা দানের ইচ্ছা প্রকাশ করে যেমন
যে-কোনো নারী, মা, বোন, স্ত্রী আর কন্যাকে দেয়া হয়। আবার সে মনে মনে ভাবে, তার আকার ইঙ্গিতেও লাজবন্তির প্রতি সংঘটিত নির্যাতনের কথা
স্মরণ করা উচিত হবেনা। কারণ তার হৃদয় আহত, সেটা
অত্যন্ত নাজুক যেমন লজ্জাবতী পাতা-হাত লাগালেই সংকুচিত হয়ে যায়।
অতএব, ‘হৃদয়ে
পুনর্বাসন’ কর্মসূচিকে বাস্তবায়নের জন্য ‘মোল্লা শুকুর’ মহল্লায়
গঠিত কমিটি কয়েক দফা প্রভাত ফেরী বের করেছে। ভোর চার থেকে পাঁচটা হলো প্রভাত ফেরীর
উপযুক্ত সময়। লোকজনের ভীড় আর ট্রাফিক জাম থাকে না, সারারাত
চৌকিদারী করার জন্য জেগে থাকা কুকুরগুলো পর্যন্ত রুটি তৈরির চুল্লির পাশে কু-লী
পাকিয়ে শুয়ে থাকে। বাড়িতে ভোরবেলা বিছানায় ঘুমন্ত লোকগুলো প্রভাত ফেরির আওয়াজ শুনে
মন্তব্য করে, ওই সেই হৈচৈ। তারপর ধৈর্য্য সহকারে বাবু
সুন্দর লালের প্রচারণা শুনতে থাকে। যেসব মহিলা নিরাপদে এপারে ফিরে এসেছে, ওরা তাদের স্বামীর বাহু বন্ধনে বুকের সাথে জড়িয়ে প্রভাত
ফেরীর হৈ চৈ এর জন্য মুখে মিন মিন করে প্রতিবাদ জানায়। ঘুমন্ত শিশুরা মিছিলের
আওয়াজ শুনে সামান্য সময়ের জন্য চোখ খুলে আর হতভাগ্য ফরিয়াদী আর বিষন্ন মানুষের
প্রচারণার গান ভেবে আবার ঘুমিয়ে পড়ে।
কিন্তু ভোরবেলা কানে যে শব্দ প্রবেশ করে তা
বৃথা যায় না। সেটা সারাদিন চিন্তা রাজ্যে বাদানুবাদের মতো চক্কর দিতে থাকে। অনেক
মানুষ-এর অর্থ ও বুঝতে পারে না। তবুও গুন গুন করতে থাকে। এই আওয়াজই গৃহে
পুনর্বাসনের বিষয় ছিল। কিছুদিন আগে মিস মৃদুলা সারা বাই ভারত-পাকিস্তানের মধ্যে
অপহৃত মহিলাদের হস্তান্তরের জন্য এনেছিলেন, তখন
মোল্লা শুকুর মহল্লার কিছু অধিবাসী ওদেরকে পুনর্বাসনের জন্য সম্মত হয়। ওরা ওয়ারিশ
শহরের বাইরে কোলা থানায় দেখা করতে গেল। অপহৃত মহিলারা এবং তাদের গ্রহণকারী লোকজন
কিছুক্ষণ যাবত পরস্পরের দিকে তাকিয়ে থাকে। তারপর মাথা নিচু করে নিজেদের সংসার
পুনরায় স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনতে ওরা বাড়িতে চলে যায়। রেসালো, নেকীরাম এবং সুন্দরলাল বাবু একবার ‘মহেন্দ্র সিং জিন্দাবাদ’, একবার ‘মোহন লাল জিন্দাবাদ’ শ্লোগান
দিতে থাকে। শ্লোগান দিতে দিতে ওদের গলা শুকিয়ে যায়।
আবার অপহৃত মেয়েদের অনেককে তাদের স্বামী, বাবা মা, ভাই বোনেরা
তাদেরকে না চেনার ভান করে এবং তাদের সাথে সম্পর্কের কথা অস্বীকার করে। অবশ্য এরা
মৃত্যুবরণ করে নি কেন? নিজেদের সতীত্ব রক্ষার জন্য বিষপানে
আত্মহত্যা করে নি কেন? কূপে ঝাপ দিয়ে আত্মহত্যা করতে পারত।
কারণ এরা ছিল ভীরু, তাই জীবন বিলিয়ে পারে নি বরং জীবনকে
বাঁচিয়ে রেখেছে।
অগণিত হাজারো মহিলা তাদের সতীত্ব লুণ্ঠনের আগে
প্রাণ বিসর্জন দিয়েছে কিন্তু তারা তো জানতনা, জীবিত
থেকে ওরা কীইবা বীরত্ব দেখাল। পাথরের মতো চোখগুলো ওদেরকে এখন মৃত্যুকে তীর্যক
দৃষ্টিতে অবলোকন করছে। এমনকি স্বামীরা পর্যন্ত ওদেরকে চিনতে পারছে না। অনেকে বার
বার নিজের নাম উচ্চারণ করছে। সোহাগ দানী, সোহাগ
বিন্তি, তাদের ভাইদের অগ্নিমূর্ত্তি দেখে
সর্বশেষ মিনতির সুরে বলছে, ‘বাহারী তুমিও আমাকে চিনলে না? আমি তোমাকে কোলে বসিয়ে খাইয়েছি।’ আর বাহারী চিৎকার করতে চায় তারপর মাতা পিতার দিকে তাকায়।
বাবা মা বুকে হাত রেখে নারায়ণ বাবার দিকে তাকায় এবং অত্যন্ত অসহায় অবস্থায় নারায়ণ
বাবা আকাশের দিকে তাকায়; যার আসলে কোনো বাস্তবতা নেই এবং সেটা
ছিল আমাদের দৃষ্টির ভ্রম। এর একটি সীমারেখা আছে। যার উপরে আমাদের দৃষ্টি যায় না।
কিন্তু সামরিক বাহিনীর ট্রাকে মিস সারা বাই
বিনিময়ের জন্য যেসব মহিলাদের এনেছিল, ওদের মাঝে
লাজু ছিল না। সুন্দর লাল অনেক আশা নিয়ে ট্রাক থেকে অবতরণকারী শেষ মেয়েটিকে পর্যন্ত
দেখেছে। অতঃপর সে নীরবে অত্যন্ত উৎসাহ নিয়ে কমিটির তৎপরতা শুরু করে। এখন সে শুধু
ভোরে প্রভাত ফেরী তো আছেই বরং সন্ধ্যায় ও মিছিল বের করে। অনেক সময় এক-আধ ঘণ্টা
স্থায়ী ছোটোখাটো জনসভারও আয়োজন করছিল। এই জনসভায় কমিটির বৃদ্ধ সভাপতি উকিল কালকা
প্রসাদ সুফির কাশি মিশানো বক্তৃতা শোনা যেত। রেসাল সর্বদা উকিল সাহেবের পাশে
পিকদানি নিয়ে দায়িত্ব পালন করত। লাউড স্পীকার থেকে বিচিত্র আওয়াজ আসত। থানার
নেকীরাম কেরানী বক্তৃতা দিতে গিয়ে ধর্ম শাস্ত্র ও পুরানের আলেক উদ্ধৃতি দিত আর
উদ্দেশ্য বিহীন বক্তব্য রাখত। ফলে উপস্থিত দর্শকরা মাঠ ত্যাগ করতে শুরু করত। তখন
সুন্দরলাল বাবু বক্তৃতা দিতে মাইকের সামনে হাজির হতো। কিন্তু সে দুটি বাক্যের বেশি
কোন কথাই বলতে পারত না। তার গলায় কথা আটকে যেত। অবশেষে বসে পড়ত। তিনি কেঁদে ফেলতেন, দু চোখ দিয়ে অশ্রুধারা বইত। আবেগ আপ্লুত হওয়ায় বক্তৃতা করতে
পারতেন না। কিন্তু উপস্থিত জমায়েত শ্রোতার মাঝে এক বিচিত্র- ধরনের নীরবতা বিরাজ
করত। সুন্দর লাল বাবুর দু বাক্যের বক্তব্য তাদের হৃদয়ের গভীরে প্রবেশ করত; উকিল কালকা প্রসাদ সুফির উপদেশমূলক বক্তৃতাকে ও ছাড়িয়ে যেত।
উপস্থিত শ্রোতারা তখনই কেঁদে ফেলত আর আবেগ আপ্লুত হয়ে চিন্তামুক্ত হয়ে বাড়ি ফিরত।