চোখ : জয়ন্ত মহাপাত্র (অনুবাদ গল্প)

ও চোখ দুটো বন্ধ করল। খুব আবছা হাসির টুকরো ঠোঁটের কোণে। মেনে নেওয়ার হাসি। একেবারে নিজস্ব। আর ঠিক তখনই আমার মনে ঝিলিক দিয়ে গেল, ও যা কিছুর জন্য অপেক্ষা করছে এই মুহূর্তে তা আমাদের দুজনের। দুজনকেই ভাগ করে নিতে হবে। তা না হলে এই যে আলো দোদুল্যমান আলো আমাদের যাপনে এখনতা নিভে যাবে। ফুসমন্তরে । আলো -আঁধারিতে দেখি ওর চোখের পাতা কেমন তিরতির করে কাঁপছে। নিজেকেই বুঝি স্তোক দিয়ে যাই, হয়ত অনেক করে চাওয়া এক দুকণা সুখের কুচি এখনও পড়ে আছে কোথাও। ওর মনের কোণের বাইরে।
মাথাটা একটু নামিয়ে একটা চুমু খেলাম । ওর বন্ধ চোখের পাতায়।

একটু উষ্ণ, একটু বা বুঝি ভিজে। ইদানীং যেমন মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছিল, আজ তেমনটি করল না । আমাকে মেনে নিল ওর নিশ্চুপ অভিব্যক্তিতে। এ এক এমন নীরবতা, যা নির্মমভাবে ছড়িয়ে যাচ্ছে আমাদের দৈনন্দিনতায়, সটান প্রবেশ করছে আমার শরীর ভেদ করে। অনেক অনেক অচেনা দূরত্ব পেরিয়ে কানে আসে ঢেউয়ের আছড়ে পড়ার শব্দ। বেলাভূমিতে। এই ধ্বনি আমাদের অতীত আর ভবিষ্যৎ জুড়ে বিছিয়ে; এই ধ্বনি অতীত আর ভবিষ্যতের মধ্যে রেশমি সুতোর ফাঁস। এই ধ্বনি আমার মনের মধ্যে প্রায় নিভু নিভু স্মৃতির প্রদীপের সলতেটাকে কেমন উসকে দেয়। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে ওকে খুব শান্ত অথচ অচঞ্চল ভাবে শুইয়ে দিলাম খাটে।

জিজ্ঞেস করলাম, ব্যথা করছে কি ? ঠিক প্রশ্ন নয়, অনেকটা বক্তব্যের ধাঁচে। খুব সন্তর্পণ অনুভব। আসলে কী যে বলব, বুঝে উঠতে পারি না। সকালে শ্যাম্পু করেছিল। সানসিল্ক। সেই খুব হালকা মিষ্টি গন্ধটা আমার নাকে আসছে। কেমন একটা অস্বস্তি মাথার মধ্যে টুংটাং টুংটাং ।

জবাবে শুধু মাথা নেড়ে নাএর মধ্যেই চোখ খুলেছে দৃষ্টি থমকে আছে মেঝেতে ; আমার পায়ের কাছে। আমি জানালা পেরিয়ে বাইরে তাকিয়ে; দূরে বিশাল নদীগর্ভ ঢাকতে চেষ্টা করছে আসন্ন রাত্রির অন্ধকার। আর আমার দেখার ফাঁকে ফাঁকে কেমন টিপটিপ করে জ্বলে উঠছে রক্তবিন্দু। লাল আলো। সেতুর ওপরে। ইস্পাতের শীতল স্তম্ভগুলি সাজিয়ে।
ইতিমধ্যেই রাত ঘনিয়ে এসেছে । অন্ধকারের মুখে অনেকটা যেন প্রীতম সিংয়ের ক্যানভাসে আঁকা মেয়েদের মুখের আদল নিষ্কম্প, চিন্তিত। ঘন কালচে নীল রাতের আকাশ। একটু কি বঙ্কিম বিদ্রূপ লেগে আছে? ভেতরে ভেতরে অস্থিরতা। অপেক্ষা। সূর্যোদয়ের। কিন্তু সব ছাপিয়ে আমি যেন অনুভব করছি এক অদ্ভুত অহিতেচ্ছা । হয়ত এই অন্ধকার আমার ছুঁড়ে ফেলে দিতে চাইছে বাইরে; আমাদের বাড়ির ঠিক বাইরে ওই শূন্য চবুতরায় আমরা হাঁটছি সামনে পেছনেশুধু হাঁটছি
নদীর বাতাস ভাসিয়ে নিয়ে এলো স্টিমারের ভোঁ। গম্ভীর, থমথমে রাগী । আচমকা কেমন জোয়ারের মতো আমার সমস্ত চেতনা জুড়ে পরাজয়ের ঢল।

আমি তাকালাম ওর দিকে। ও নিশ্চুপ। একটু ঝুঁকে পড়া পিঠ। খাটের ওপর।
একটুও নড়েনি । ওর সীসের মতো ভারী নিস্তব্ধতা আমার দম বন্ধ করে দিচ্ছিল।
আমার কেন মনে আসছে একটা মরা গাছ নুয়ে আছে পাহাড়ী ঝোরার ওপর?
তুমি কি ভাবো আমি সত্যি সইতে পারব? যদি তুমি চলেই যাও …? আমি কিছুতেই এই কথাটা মনে মনেও উচ্চারণ করে উঠতে পারি না। এ এক এমন বাক্যবন্ধ, যার নিঃশব্দ অভিঘাত অনুভব করা মোটেই সহজ নয়। মাত্র ছাব্বিশ বছরের সুন্দরী তরুণী স্ত্রী আমার অন্ধ হয়ে যাচ্ছে ।

ফিরে এসেছি সরকারী হাসপাতালের চোখের ডাক্তার দেখিয়ে। আপাতত ওই নাকে চশমা -আঁটা কঠিন চোখ মুখের লোকটা আমাদের মন জুড়ে বসে। যা বলেছে, কথাগুলো শুনলেই বোঝা যায় স্রেফ মিথ্যে কথা কারণ ওর মুখ ছিল অভিব্যাক্তিবিহীন। আমরা ওকে বিশ্বাস করছি, আবার যেন পুরোপুরি আস্থা রাখতেও পারছি না।
ঠিক মনে হচ্ছে আমাদের জীবনটা যেমন হবার, তেমনটা হয়েই গেছে ..এবার ওই রাস্তাতে যতটা সম্ভব সাবধানে পা ফেলতে হবে।

ওর না জানি কী ভীষণ খারাপ লাগছে । আমার ভেতরে বসে থাকা কেউ ফিসফিস করে বলছিল। সাহসই নেই আমার ওর দিকে অনুকম্পার চোখে তাকানোর। যে অর্ধস্বচ্ছ তরল ও গত দুবছর ধরে ব্যবহার করছে, যে তীব্র আলোর রশ্মি ওর কোমল চোখের তারা ভেদ করেছে বারবার নিষ্ঠুরতায় একের পর এক হাসপাতালে আমি নিশ্চিত, ও এতদিনে ক্লান্তিতে ভেঙে পড়েছে। ওর চূড়ান্ত অস্বস্তি, কষ্ট কী ভীষণভাবে প্রকট ওর মুখে ! আমার খুব ইচ্ছে করে, যেভাবে পারি ওকে খানিক স্বস্তি দিতে।

ও শোবার ঘরে। আমি ভেতরে ঢোকার আগে উদ্দেশ্যবিহীনভাবে ঠিক পাশের ঘরটায় পায়চারী করলাম খানিকক্ষণ। কেমন একটা ক্লান্তিকর দোটানা ভাব আমাকে কুরে কুরে খাচ্ছিল। সটান গিয়ে দাঁড়ালাম ওর আয়নাটার সামনে। দাঁড়িয়েই রইলাম। কিছুই না করে । নির্দিষ্ট কোনো কিছুই করছিলাম না আমি। দেখছিলামও না। শার্টের কলারটা অনাবশ্যকভাবেই ঠিকঠাক করার চেষ্টা। সত্যি, আমি একেবারে চাইছি না ওর মুখোমুখি হতে আমার এই বোকা বোকা ঢুলুঢুলু আধফোটা হাসি ঠোঁটের কোণে ঝুলিয়ে রেখে ! এ নিছক অপ্রস্তুত হাবভাব লুকোনোর চেষ্টা ছাড়া তো আর কিছুই নয় ! আর এই মুহূর্তে বুঝতেও পারছিলাম, আমার নিয়ন্ত্রিত অভিব্যক্তির আপাত দুর্ভেদ্য বর্ম কেমন ধীরে ধীরে টুকরো টুকরো হয়ে খসে পড়ছে।
আচ্ছা, আমাদের মতো দুর্বল মানসিকতার মানুষরা কি এভাবে শুধু চুপকথার খেলা খেলে যায় আজীবন ?
মনে হল, একটা কিছু পানীয় নিয়ে আসি . হয়ত ও একটু সহজ হতে পারবে ।

বরফ-ঠাণ্ডা দুধের গ্লাসের দিকে এক ঝলক তাকাল ও। আমি গ্লাস এগিয়ে ধরেছি ওর সামনে। হাসতে পারলে হাসতাম; কিন্তু হাসতে আর পারছি কই ! মেকি হাসিও নয়।

খানিক বেখাপ্পাভাবেই বললাম, নাও, দুধটুকু খেয়ে নাও। ভালো লাগবে । ও কেমন শক্ত হয়ে গেল ।
আমার দিকে তাকাল। দ্রুত, রাগী ভঙ্গিতে। এই দুটি চোখ ছায়াছায়া গভীর মায়াময় হতে পারে। বেশিরভাগ সময়ে। আমি অন্তত সেভাবেই চিনেছি। কিন্তু সেই মুহূর্তে দৃষ্টিতে এমনই তীব্রতা যা আমারই নিজেকে এক ভিনগ্রহের বাসিন্দা বলে মনে হচ্ছিল। কিংবা চিড়িয়াখানার। এক ঝটকায় ও দুধভর্তি গ্লাসটা ছুঁড়ে ফেলে দিল মেঝেতে।

একটুক্ষণের জন্য আমি হতচকিত। নির্বাক।
লাইক এন্ড শেয়ারঃ :
 
 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।