নয় বছর বয়সি ভাঙ্কা জুকভ তিনমাস ধরে কাজ শিখছে নামকরা জুতো নির্মাতা আলিয়াহিন এর কাছে। বড়োদিনের আগের রাতে বাড়ির কথা মনে করে ঘুম আসছিলো না তার। দাদুর কাছে চিঠি লেখার জন্যে সুযোগ খুঁজছিলো সে। মালিক, মালিকের বউ এবং কর্মচারীরা গির্জায় চলে যেতেই ভাঙকা মালিকের আলমারি থেকে কালির দোয়াত, মরচে ধরা নিবঅলা কলম আর দোমড়ানো মোচড়ানো একটা কাগজ নিয়ে লিখতে বসলো।
লেখা শুরু করার আগে বেশ কয়েকবার ভীত-চকিত দৃষ্টিতে জানালা, দরোজা এবং নিজের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো সে। ছোটো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে রাখা বেঞ্চটার ওপর কাগজটা বিছিয়ে হাঁটু গেড়ে বেঞ্চের ওপর ঝুঁকে লিখতে শুরু করলো।
‘প্রিয় দাদু, বড়োদিনের শুভেচ্ছা জানবেন। প্রভু যিশুর জন্মদিনে মহান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আপনাকে দীর্ঘায়ু করেন। আপনি ছাড়াতো আমার আর কেউ নেই, ঈশ্বর আমার মা-বাবা দুজনকেই কেড়ে নিয়েছেন, আমার সবকিছুইতো আপনি।”
এ পর্যন্ত লিখে ভাঙকা থেমে পড়লো। দাদুর কথা বড়ো বেশি মনে পড়ে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বুকটা হু হু করে উঠলো তার। মানসপটে স্পষ্ট সে দেখতে পেল তার দাদুর কর্মকান্ড।
ভাঙকার দাদু কন্সতান্তিন মেকারিচ নৈশপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন এক বাড়িতে। পঁয়ষট্টি বছর বয়সি নেশালু চোখের অধিকারী মেকারিচ হালকা-পাতলা শরীরের একজন শক্তসমর্থ, সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষ।
দিনের বেলা মেকারিচ চাকরদের রান্নাঘরে ঘুমান অথবা বাবুর্চির সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটান। রাতের বেলা ভেড়ার চামড়ার তৈরি একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বাড়ির চারপাশে টহল দিয়ে বেড়ান, আর ছোটো কাঠের হাতুড়ি ‘ম্যালেট’ দিয়ে হাতের তেলোতে বাড়ি মেরে মৃদু কিন্তু স্পষ্ট শব্দ করেন, যাতে বাড়ির মালিক বুঝতে পারেন যে, তিনি কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন না এবং চোর-ছ্যাঁচোড়েরা কেউ একজন পাহারায় আছে এই ভেবে কাছে ঘেঁষার সাহস না পায়।
এইসময় তার পোষা দুই কুকুর কাশতাঙকা আর ঈল তাকে অনুসরণ করে। ঈলের গায়ের রঙ কালো, বেজির মতো শরীর। অতিশয় বিনয়ী এবং আদুরে স্বভাবের ঈল কাউকে খারাপ চোখে দেখে না, নিজের মুনিবের মতোই ভদ্র ব্যবহার করে সে আগন্তুকদের সাথেও। কিন্তু তার এই আপাত ভদ্রতার আড়ালে যে একটা বদমাশ লুকিয়ে আছে সেটা আশপাশের লোকজনই শুধু জানে। কারো ভাঁড়ারে ঢুকে খাবার চুরি করা কিংবা গ্রামের কৃষকের বাড়ি থেকে মুরগি চুরি করাতে তার জুড়ি নেই। আর এ কারণে তাকে কতোবার যে পিটিয়ে আধমরা করা হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তারপরও তার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এই মুহূর্তে কোনো সন্দেহ নেই তার দাদু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গির্জার লাল জানালাগুলোর ওপর চোখ বোলাচ্ছেন। ভারী বুটের খটখট আওয়াজ তুলে চাকর চাকরানিদের সাথে মজা করছেন। ছোট্ট ম্যালেটটা তার কোমরে বেল্টে ঝোলানো। হাতে হাত ঘষে মেকারিচ ঠান্ডা তাড়াবার চেষ্টা করছেন, আর ফাঁকে ফাঁকে বাবুর্চি কিংবা কোনো চাকরানির পেটে গুঁতো মারছেন দুষ্টুমি করে।
‘নস্যি চলবে?’ চাকরানির উদ্দেশে জিজ্ঞাসা তাঁর। মহিলা হাত বাড়িয়ে একচিমটি তামাকের গুঁড়ো নিয়ে নাকে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। খুশিতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন মেকারিচ। বললেন, ‘সর্দির জন্যে খাসা জিনিস কিন্তু!’
তারা মজা করার জন্যে কাশতাঙকার নাকেও শুঁকালেন, শ্বাস টেনেই চমকে উঠলো কাশতাঙকা। অস্থিরভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে বাইরে চলে গেল কুকুরটা। সঙ্গিনীর করুণ অবস্থা দেখে নস্যি নেওয়ায় অসম্মতি জানালো ঈল, কিন্তু তার লোকদেখানো বিনয়ী স্বভাবের কারণে লেজ নাড়াতে শুরু করলো মাথা নিচু করে।
চমৎকার আবহাওয়া। পরিষ্কার তাজা বাতাস বইছে চারিদিকে। দৃষ্টিগ্রাহ্য অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো গ্রাম। তুষারে ঢাকা গ্রামের বাড়িগুলোর শাদা ছাদ জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারেও; আর চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা কুন্ডলি পাকানো ধোঁয়া সহজেই নজর কাড়ে।
গাছগুলো ঢেকে আছে শ্বেত-শুভ্র তুষারে। আকাশে ঝিলমিল করছে তারকারাজি। সারা আকাশ যেন কিসের আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে। পুরো ব্রহ্মান্ড মনে হয় স্নান করে নিজেকে পুত-পবিত্র করে নিয়েছে বড়োদিনের খুশিতে।বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভাঙকার। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে আবার।
“গতকাল মালিক আমাকে খুব গালাগালি আর মারধোর করেছে। আমার চুলের মুঠি ধরে উঠোনে বের করে দিয়েছে। ভীষণ মেরেছে জুতো রাখার স্ট্রেচার দিয়ে, কারণ আমি তাদের বাচ্চাটাকে দোলনায় দোল দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গত সপ্তাহে মালিকের বউ আমাকে হেরিং মাছ পরিষ্কার করতে বলেছিলো, আমি মাছের লেজের দিক থেকে কাটা শুরু করেছিলাম বলে বেগম সাহেবা এসে মাছগুলো আমার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে। অন্য কর্মচারিগুলো সবসময় তামাশা করে আমাকে নিয়ে। প্রায়ই তারা আমাকে ভদকা আনতে পাঠায় শুঁড়িখানায়। কখনো বাধ্য করে মালিকের ঘর থেকে শশা চুরি করে আনার জন্যে, আর মালিক একথা জানতে পেরে হাতের কাছে যা পায় তা-ই দিয়ে মারতে শুরু করে।
বেশি কষ্ট পাই খাবার নিয়ে, একদিনও পেট ভরে খেতে পারি নি এখানে,দাদু। সকালে সামান্য রুটি, দুপুরে খিচুড়ি আর রাতে আবার সেই রুটি। চা কিংবা স্যুপ কখনো কপালে জোটে না, মালিক আর তার বউই সব খেয়ে শেষ করে। রাতের বেলা শুতে দেয় বারান্দায় চলার পথে। তাদের বাচ্চাটা যখন কেঁদে ওঠে তখন আমার ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ, বাচ্চাটাকে দোলনা দিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে অনেক সময় লেগে যায়।
প্রিয় দাদু, প্রভু যিশুর দোহাই লাগে, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। নতমস্তকে আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি দাদু, আমাকে নিয়ে যান, নইলে আমি মরে যাবো।
বিড়বিড় করে কথা বলছে ভাঙকা। দুচোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। শীর্ণকায় দুই হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে লিখে যাচ্ছে।
‘আমি আপনার তামাক সাজিয়ে দেবো, দাদু। ঈশ্বরের কাছে আপনার জন্যে প্রার্থনা করবো। যদি কোনো ভুল করি আপনার যেভাবে খুশি আমাকে শাস্তি দেবেন দাদু। রোজগারের জন্যে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, দরকার হলে আমি নায়েবের জুতো পরিষ্কার করবো। নয়তো মেষপালকের চাকরি নেবো।
প্রিয় দাদু, আমি আর সহ্য করতে পারছি না, এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি অনেকবার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার জুতো নেই বলে পারি নি। বাইরে এতো বেশি বরফ যে, খালি পায়ে কিছুদূর গেলেই পা জমে যাবে। সেই ভয়ে যেতে পারি নি।
‘প্রিয় দাদু, আমি যখন বড়ো হবো তখন আপনার দেখাশোনা করবো। আপনার যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবো। আর আপনি যদি কখনো মারা যান আমি আপনার আত্মার শান্তির উদ্দেশে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো, যেভাবে আমি আমার মায়ের জন্যে সবসময় করি।
‘মস্কো খুব বড়ো শহর। শিক্ষিত, ভদ্রশ্রেণির লোকদের বসবাস এখানে। প্রচুর ঘোড়া আছে এই শহরে, কিন্তু কোনো ভেড়া নেই। আর এই শহরের কুকুরগুলো কিন্তু মোটেও হিংস্র নয়। এখানকার তরুণরা বড়োদিনে কখনো তারকা হাতে দুয়ারে দুয়ারে গান করতে যায় না। একদিন একটা দোকানে দেখলাম মাছ ধরার ছিপ-বড়শি রাখা হয়েছে বিক্রি করার উদ্দেশে। প্রায় সবধরণের মাছ ধরার জন্যে তৈরি করে সুতো-বড়শি সমেত। সবচেয়ে মজবুত ছিপ যেটা ছিলো সেটা দিয়ে অনায়াসে চল্লিশ পাউন্ড ওজনের যে-কোনো মাছ তুলে আনা যাবে।
লেখা শুরু করার আগে বেশ কয়েকবার ভীত-চকিত দৃষ্টিতে জানালা, দরোজা এবং নিজের চারপাশে একবার চোখ বুলিয়ে নিলো সে। ছোটো একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে সামনে রাখা বেঞ্চটার ওপর কাগজটা বিছিয়ে হাঁটু গেড়ে বেঞ্চের ওপর ঝুঁকে লিখতে শুরু করলো।
‘প্রিয় দাদু, বড়োদিনের শুভেচ্ছা জানবেন। প্রভু যিশুর জন্মদিনে মহান ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি তিনি যেন আপনাকে দীর্ঘায়ু করেন। আপনি ছাড়াতো আমার আর কেউ নেই, ঈশ্বর আমার মা-বাবা দুজনকেই কেড়ে নিয়েছেন, আমার সবকিছুইতো আপনি।”
এ পর্যন্ত লিখে ভাঙকা থেমে পড়লো। দাদুর কথা বড়ো বেশি মনে পড়ে যাচ্ছে। জানালা দিয়ে বাইরের অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে বুকটা হু হু করে উঠলো তার। মানসপটে স্পষ্ট সে দেখতে পেল তার দাদুর কর্মকান্ড।
ভাঙকার দাদু কন্সতান্তিন মেকারিচ নৈশপ্রহরী হিসেবে কাজ করেন এক বাড়িতে। পঁয়ষট্টি বছর বয়সি নেশালু চোখের অধিকারী মেকারিচ হালকা-পাতলা শরীরের একজন শক্তসমর্থ, সদা হাস্যোজ্জ্বল মানুষ।
দিনের বেলা মেকারিচ চাকরদের রান্নাঘরে ঘুমান অথবা বাবুর্চির সাথে গল্পগুজব করে সময় কাটান। রাতের বেলা ভেড়ার চামড়ার তৈরি একটা চাদর গায়ে জড়িয়ে বাড়ির চারপাশে টহল দিয়ে বেড়ান, আর ছোটো কাঠের হাতুড়ি ‘ম্যালেট’ দিয়ে হাতের তেলোতে বাড়ি মেরে মৃদু কিন্তু স্পষ্ট শব্দ করেন, যাতে বাড়ির মালিক বুঝতে পারেন যে, তিনি কাজে ফাঁকি দিচ্ছেন না এবং চোর-ছ্যাঁচোড়েরা কেউ একজন পাহারায় আছে এই ভেবে কাছে ঘেঁষার সাহস না পায়।
এইসময় তার পোষা দুই কুকুর কাশতাঙকা আর ঈল তাকে অনুসরণ করে। ঈলের গায়ের রঙ কালো, বেজির মতো শরীর। অতিশয় বিনয়ী এবং আদুরে স্বভাবের ঈল কাউকে খারাপ চোখে দেখে না, নিজের মুনিবের মতোই ভদ্র ব্যবহার করে সে আগন্তুকদের সাথেও। কিন্তু তার এই আপাত ভদ্রতার আড়ালে যে একটা বদমাশ লুকিয়ে আছে সেটা আশপাশের লোকজনই শুধু জানে। কারো ভাঁড়ারে ঢুকে খাবার চুরি করা কিংবা গ্রামের কৃষকের বাড়ি থেকে মুরগি চুরি করাতে তার জুড়ি নেই। আর এ কারণে তাকে কতোবার যে পিটিয়ে আধমরা করা হয়েছে তার কোনো ইয়ত্তা নেই। কিন্তু তারপরও তার স্বভাবের কোনো পরিবর্তন হয়নি।
এই মুহূর্তে কোনো সন্দেহ নেই তার দাদু গেটের সামনে দাঁড়িয়ে গির্জার লাল জানালাগুলোর ওপর চোখ বোলাচ্ছেন। ভারী বুটের খটখট আওয়াজ তুলে চাকর চাকরানিদের সাথে মজা করছেন। ছোট্ট ম্যালেটটা তার কোমরে বেল্টে ঝোলানো। হাতে হাত ঘষে মেকারিচ ঠান্ডা তাড়াবার চেষ্টা করছেন, আর ফাঁকে ফাঁকে বাবুর্চি কিংবা কোনো চাকরানির পেটে গুঁতো মারছেন দুষ্টুমি করে।
‘নস্যি চলবে?’ চাকরানির উদ্দেশে জিজ্ঞাসা তাঁর। মহিলা হাত বাড়িয়ে একচিমটি তামাকের গুঁড়ো নিয়ে নাকে দিয়ে চিৎকার করে উঠলো। খুশিতে অট্টহাসিতে ফেটে পড়লেন মেকারিচ। বললেন, ‘সর্দির জন্যে খাসা জিনিস কিন্তু!’
তারা মজা করার জন্যে কাশতাঙকার নাকেও শুঁকালেন, শ্বাস টেনেই চমকে উঠলো কাশতাঙকা। অস্থিরভাবে মাথা দোলাতে দোলাতে বাইরে চলে গেল কুকুরটা। সঙ্গিনীর করুণ অবস্থা দেখে নস্যি নেওয়ায় অসম্মতি জানালো ঈল, কিন্তু তার লোকদেখানো বিনয়ী স্বভাবের কারণে লেজ নাড়াতে শুরু করলো মাথা নিচু করে।
চমৎকার আবহাওয়া। পরিষ্কার তাজা বাতাস বইছে চারিদিকে। দৃষ্টিগ্রাহ্য অন্ধকারে ছেয়ে আছে পুরো গ্রাম। তুষারে ঢাকা গ্রামের বাড়িগুলোর শাদা ছাদ জ্বলজ্বল করছে অন্ধকারেও; আর চিমনি থেকে বেরিয়ে আসা কুন্ডলি পাকানো ধোঁয়া সহজেই নজর কাড়ে।
গাছগুলো ঢেকে আছে শ্বেত-শুভ্র তুষারে। আকাশে ঝিলমিল করছে তারকারাজি। সারা আকাশ যেন কিসের আগমনী বার্তা ঘোষণা করছে। পুরো ব্রহ্মান্ড মনে হয় স্নান করে নিজেকে পুত-পবিত্র করে নিয়েছে বড়োদিনের খুশিতে।বুক চিরে দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে এলো ভাঙকার। দোয়াতে কলম ডুবিয়ে নিয়ে লিখতে শুরু করলো সে আবার।
“গতকাল মালিক আমাকে খুব গালাগালি আর মারধোর করেছে। আমার চুলের মুঠি ধরে উঠোনে বের করে দিয়েছে। ভীষণ মেরেছে জুতো রাখার স্ট্রেচার দিয়ে, কারণ আমি তাদের বাচ্চাটাকে দোলনায় দোল দিতে দিতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম। গত সপ্তাহে মালিকের বউ আমাকে হেরিং মাছ পরিষ্কার করতে বলেছিলো, আমি মাছের লেজের দিক থেকে কাটা শুরু করেছিলাম বলে বেগম সাহেবা এসে মাছগুলো আমার মুখের ওপর ছুঁড়ে মারে। অন্য কর্মচারিগুলো সবসময় তামাশা করে আমাকে নিয়ে। প্রায়ই তারা আমাকে ভদকা আনতে পাঠায় শুঁড়িখানায়। কখনো বাধ্য করে মালিকের ঘর থেকে শশা চুরি করে আনার জন্যে, আর মালিক একথা জানতে পেরে হাতের কাছে যা পায় তা-ই দিয়ে মারতে শুরু করে।
বেশি কষ্ট পাই খাবার নিয়ে, একদিনও পেট ভরে খেতে পারি নি এখানে,দাদু। সকালে সামান্য রুটি, দুপুরে খিচুড়ি আর রাতে আবার সেই রুটি। চা কিংবা স্যুপ কখনো কপালে জোটে না, মালিক আর তার বউই সব খেয়ে শেষ করে। রাতের বেলা শুতে দেয় বারান্দায় চলার পথে। তাদের বাচ্চাটা যখন কেঁদে ওঠে তখন আমার ঘুম হারাম হয়ে যায়। কারণ, বাচ্চাটাকে দোলনা দিয়ে ঘুম পাড়াতে পাড়াতে অনেক সময় লেগে যায়।
প্রিয় দাদু, প্রভু যিশুর দোহাই লাগে, আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি আর সহ্য করতে পারছি না। নতমস্তকে আমি আপনার কাছে প্রার্থনা করছি দাদু, আমাকে নিয়ে যান, নইলে আমি মরে যাবো।
বিড়বিড় করে কথা বলছে ভাঙকা। দুচোখ বেয়ে জল গড়াচ্ছে। শীর্ণকায় দুই হাত দিয়ে চোখের জল মুছতে মুছতে লিখে যাচ্ছে।
‘আমি আপনার তামাক সাজিয়ে দেবো, দাদু। ঈশ্বরের কাছে আপনার জন্যে প্রার্থনা করবো। যদি কোনো ভুল করি আপনার যেভাবে খুশি আমাকে শাস্তি দেবেন দাদু। রোজগারের জন্যে আপনি কোনো চিন্তা করবেন না, দরকার হলে আমি নায়েবের জুতো পরিষ্কার করবো। নয়তো মেষপালকের চাকরি নেবো।
প্রিয় দাদু, আমি আর সহ্য করতে পারছি না, এরা আমাকে মেরে ফেলবে। আপনি আমাকে এখান থেকে নিয়ে যান। আমি অনেকবার পালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছি, কিন্তু আমার জুতো নেই বলে পারি নি। বাইরে এতো বেশি বরফ যে, খালি পায়ে কিছুদূর গেলেই পা জমে যাবে। সেই ভয়ে যেতে পারি নি।
‘প্রিয় দাদু, আমি যখন বড়ো হবো তখন আপনার দেখাশোনা করবো। আপনার যাতে কোনো অসুবিধা না হয় সেদিকে খেয়াল রাখবো। আর আপনি যদি কখনো মারা যান আমি আপনার আত্মার শান্তির উদ্দেশে ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করবো, যেভাবে আমি আমার মায়ের জন্যে সবসময় করি।
‘মস্কো খুব বড়ো শহর। শিক্ষিত, ভদ্রশ্রেণির লোকদের বসবাস এখানে। প্রচুর ঘোড়া আছে এই শহরে, কিন্তু কোনো ভেড়া নেই। আর এই শহরের কুকুরগুলো কিন্তু মোটেও হিংস্র নয়। এখানকার তরুণরা বড়োদিনে কখনো তারকা হাতে দুয়ারে দুয়ারে গান করতে যায় না। একদিন একটা দোকানে দেখলাম মাছ ধরার ছিপ-বড়শি রাখা হয়েছে বিক্রি করার উদ্দেশে। প্রায় সবধরণের মাছ ধরার জন্যে তৈরি করে সুতো-বড়শি সমেত। সবচেয়ে মজবুত ছিপ যেটা ছিলো সেটা দিয়ে অনায়াসে চল্লিশ পাউন্ড ওজনের যে-কোনো মাছ তুলে আনা যাবে।