আলেক্সান্দার দ্যা গ্রেট


আলেক্সান্দার দ্যা গ্রেট, রাজত্বকাল ৩৩৬ - ৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ
পূর্ণ নাম ম্যাসেডনের তৃতীয় আলেকজান্দার
গ্রিক Μέγας Ἀλέξανδροςiv[›] (Mégas Aléxandros, Great Alexander) , Ἀλέξανδρος ὁ Μέγας (Aléxandros ho Mégas, Alexander the Great)

উপাধি হেলেনীয় লিগের হেজিমন, পারস্যের শাহেনশাহ, মিশরের ফ্যারাও ও এশিয়ার প্রভু

পূর্বসূরি ম্যাসেডনের দ্বিতীয় ফিলিপ

উত্তরসূরি ম্যাসেডনের চতুর্থ আলেকজান্দার
ম্যাসেডনের তৃতীয় ফিলিপ

স্ত্রীরা ব্যাকট্রিয়ার রোক্সানা
পারস্যের স্টেটেইরা

সন্তানাদি ম্যাসেডনের চতুর্থ আলেকজান্দার
রাজবংশ আরগেড রাজবংশ

পিতা ম্যাসেডনের দ্বিতীয় ফিলিপ
মাতা ইপিরাসের অলিম্পিয়াস



একজন সম্রাটের অবশ্যই প্রতিভা না থাকলে মাত্র চব্বিশ বছর বয়সে অর্ধপৃথিবীর ঈশ্বরে পরিনত হওয়া সম্ভব নয়। অবশ্যই তার প্রতিভা ছিলো সেনাবাহিনীকে বশীভূত করার। আমি এখানে তার স্বৈরাচারী দিকটা তুলে ধরব। যার দ্বারা আপনি অবশ্যই আলেক্সান্দারকে একজন রক্তপিপাসু কসাই বলতে পারবেন অনায়াসে। পবিত্র বাইবেলের বুক অব্ব দানিয়েলে আলেক্সান্দারকে বলা হয়েছে তৃতীয় পশু যে মানবজাতির জন্য অভিশাপস্বরূপ। আল কোরআনে আলেক্সান্দার সম্পর্কে বলা হয়েছে শেষ জমানায় শয়তানের সাথে আবির্ভূত হবেন এবং পৃথিবীতে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালাবেন। 


আলেকজান্দার  (জন্ম - জুলাই খ্রিস্টপূর্ব ৩৫৬, মৃত্যু জুন ১১, খ্রিস্টপূর্ব ৩২৩)পৃথিবীর ইতিহাসে অন্যতম সফল সামরিক প্রধান। তিনি তৃতীয় আলেকজান্দার বা মেসিডনের রাজা হিসেবেও পরিচিত। তিনি ছিলেন মেসিডোনিয়ার শাসনকর্তা। মেসিডোনিয়া বর্তমান গ্রীসের অন্তর্গত একটি অঞ্চল। তার পিতা ফিলিপ ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা। তার মৃত্যুর পূর্বে তিনি পরিচিত পৃথিবীর বেশির ভাগ জয় করেছিলেন। আলেকজান্দার তার সামরিক কৌশল ও পদ্ধতির জন্য বিশ্ব বিখ্যাত। তিনি পারস্যে অভিশপ্ত আলেকজান্দার নামেও পরিচিত, কারণ তিনি পারস্য সাম্রাজ্য জয় করেন এবং এর রাজধানী পারসেপলিস ধ্বংস করেন। তিনি ফারসি ভাষায় "ইস্কান্দর, মধ্য পশ্চিমা স্থানে যুল-কারনাইন, আরবে আল-ইস্কান্দার আল কাবের", উর্দুতে সিকান্দার-এ-আজম, পস্তুতে স্কান্দর, হিব্রুতে "আলেকজান্দার মোকদন, আরমেনিয়ানয়ে ট্রে-কারনাইয়া"। তার এজাতীয় কিছু নামের অর্থ "দুই শিং বিশিষ্ট" (যুল-কারনাইন, ট্রে-কারনাইয়া), আবার উর্দু ও হিন্দিতে সিকান্দার যার অর্থ পারদর্শি" বা অত্যন্ত পারদর্শি।

আলেকজান্দারের পিতা দ্বিতীয় ফিলিপ তার শাসনামলে গ্রিসের নগর রাষ্ট্রগুলোকে নিজের শাসনাধীনে আনেন। আলজান্ডার নিজেও এই নগররাষ্ট্রগুলিকে একত্রিত করতে অভিযান চালান কারণ ফিলিপের মৃত্যুর পর এগুলো বিদ্রোহ করেছিল। এরপর আলেকজান্দার একে একে পারস্য, আনাতোলিয়া, সিরিয়া, ফোনিসিয়া, জুডিয়া, গাজা, মিশর, ব্যাক্ট্রিয়া এবং মেসোপটেমিয়া জয় করেন। তার সাম্রাজ্য মেসিডোনিয়া থেকে পাঞ্জাব পর্যন্ত বিস্তৃত হয়। পিতার মৃত্যুর পর আলেকজান্দার পশ্চিমে অভিযান চালান ইউরোপ জয় করার জন্য। এরপর তিনি পূর্বে অভিযান চালানোর পরিকল্পনা করেন, কারণ শৈশবে তার শিক্ষক বিশ্ববিখ্যাত দার্শনিক, বিজ্ঞান এরিস্টোটল তাকে বলেছিলেন কোথায় ভূমি শেষ হয় এবং মহাসাগর শুরু হয়। আলেকজান্দার তার সেনাবাহিনী ও প্রশাসনে বিদেশী (বিশেষ করে যারা গ্রিক বা মেসিডোনিয়ান নয়) ব্যক্তিদের অন্তর্ভুক্ত করেন। এর মধ্যে কিছু জ্ঞানী ব্যক্তি তাকে "একত্রিকরণ"-এর ব্যাপারে ধারণা দেয়। তিনি তার সেনাবাহিনীতে বিদেশীদের সাথে বিবাহ উৎসাহিত করেন এবং নিজেও বিদেশী মেয়েদের বিয়ে করেন। প্রায় ১২ বছরের সামরিক অভিযানের পর আলেকজান্দার মৃত্যুবরণ করেন। ধারণা করা হয় হয়ত তিনি ম্যালেরিয়া, টাইফয়েড অথবা ভাইরাল এনকেফালাইটিস্‌ এর আক্রান্ত হয়ে মারা যান। হেলেনেস্টিক যুগে তার অভিযানের কাহিনী লোকের মুখে মুখে প্রচলিত ছিল। আলেকজান্দারের অভিযানের ফলে বিভিন্ন সভ্যতার মিলন ঘটে (মিশর, গ্রিক, পারস্য, ভারতীয়) এক নতুন সভ্যতার শুরু হয়। এই সভ্যতাই হেলেনেস্টিক সভ্যতা। গ্রিক ও গ্রিসের বাইরের বিভিন্ন সভ্যতায় আলেকজান্দার ইতিহাসে, সাহিত্যে, পুরাণে জীবিত হয়ে আছেন।

আলেক্সান্দারের নিষ্ঠুরতা শুরু হয় ১৬ বছর বয়সে। ৩৪০ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ পুত্র আলেক্সান্দারকে প্রতিনিধি করে থ্রেসের মেইদি বিদ্রোহীদের বিরুদ্ধে অভিযানে পাঠান। আলেক্সান্দার তাদের প্রধান শহর দখল করে নিজের নামে নামকরণ করেন আলেক্সান্দারোপোলিস। দুই বছর পর কাইরোনিয়া যুদ্ধে সে নিষ্ঠুর আক্রমণ চালায় এবং সকল সেনাধিপতিকে জবাই করেন। 

আলেকজান্ডার ছিলেন মেসিডোনিয়ার রাজা দ্বিতীয় ফিলিপ ও তার চতুর্থ স্ত্রী অলিম্পাসের সন্তান। পাউলতার্চ হতে জানা যায় মূলত ফিলিপ আলেকজান্ডারের পিতা ছিলেন না। অলিম্পাস সাপের সাথে থাকতে অভস্থ্য হওয়ায় ফিলিপ তার সাথে মিলিত হতে ভীত ছিলেন এবং জিউস অলিম্পাসের গর্ভে আলেকজান্ডারের জন্মের জন্য দায়ী। পাউলতার্চ আরও বলেন যে, অলিম্পাস ও ফিলিপ উভয়েই তাদের ভবিষ্যত সন্তানের জন্মের স্বপ্ন দেখেছিলেন। অলিম্পাস দেখেন তার গর্ভের ভিতর বজ্রপাত ও আলোকপাত হচ্ছে। ফিলিপের স্বপনে ছিল যে সে অলিম্পাসের গর্ভে সিংহের সিল মেরে দিচ্ছেন। এই স্বপ্নের পর ফিলিপ ভবিষ্যত বক্তা এরিস্টান্ডারের সাথে কথা বলেন। এরিস্টান্ডার বলেন যে, অলিম্পাস গর্ভবতী ও তার সন্তানের সিংহের ন্যায় চরিত্র হবে।[১] আর একটি অলৌকিক ঘটনা হল, আলেকজান্ডারের জন্মের ঠিক সময়ই ইফেসাস এর আর্টেমিস এর মন্দিরে আগুন ধরে যায়। পাউলতার্চ এই ঘটনাকে এভাবে ব্যাখ্যা করেন, সৃষ্টিকর্তা মন্দিরের খেয়াল রাখার থেকেও বেশি আলেকজান্ডারের খেয়াল রাখছিলেন"।
চিত্র:AlexanderAttackingDarius.jpg 
আলেকজান্ডার ও বুসেফেলাস (দারিয়ুস এর সাথে যুদ্ধে)
একদিন আলেকজান্ডার তার পিতার সাথে হাটছিলেন। তারা একস্থানে এসে দেখলেন কতগুলো লোক একটি কাল পাগলা ঘোড়াকে বশে আনতে চেষ্টা করছে। আলেকজান্ডারের ঘোড়াটাকে পছন্দ হল এবং তিনি তার পিতার কাছে আর্জি করলেন তাকে ঐ ঘোড়াটা কিনে দিতে। ফিলিপ হেসে বললেন, তুমি যদি ঘোড়াটাকে বশে আনতে পারেন, তবেই ঘোড়াটাকে তুমি পেতে পার। আলেকজান্ডার ঘোড়াটাকে ভাল মত লক্ষ্য করে বুঝতে পারলো, আসলে ঘোড়াটা তার নিজের ছায়া (ঘোড়ার) প্রতি ভীত। সে ঘোড়াটার দিকে এগিয়ে গেলেন এবং ওটাকে সূর্যের দিকে মুখ করালেন যেন সে তার নিজের ছায়ার দিকে লক্ষ্য করতে না পারে। ফলশ্রুতিতে, ঘোড়াটা সহজেই বশে আসলো। ফিলিপ ঘোড়াটাকে আলেকজান্ডারকে কিনে দিলেন। আলেকজান্ডার ঘোড়াটার নামকরণ করলেন, বুসেফেলাস (যার অর্থ ষাড়ের মাথা)। বুসেফেলাস আলেকজান্ডারের শেষ যুদ্ধে মৃত্যুবরণ করার আগ পর্যন্ত সকল যুদ্ধে আলেকজান্ডারের সাথে ছিল। ভারত হতে ফেরার সময় আলেকজান্ডারে বুসেফেলাসের নামে একটি স্থানের নামকরণ করেন।


৩৩৬ খ্রিষ্টপূর্বাব্দে সে মেসিডোনিয়ার রাজাসনে বসেন। তার বাবার হত্যার পিছনে তার হাত ছিলো। ফিলিপ সম্প্রতি দ্বিতীয় বিবাহ করেন। সেই ঘরে পুত্র সন্তান জন্ম নেয়। যার দ্বারা আলেক্সান্দারের উত্তরাধিকার হওয়ার পথে বাঁধা তৈরী হতে পারে। আলেক্সান্দারের মা এই সতীন পুত্র এবং তার শিশু বোনকে হত্যা করেন। ফিলিপের নতুন বউকেও হত্যা করা হয়। 

গ্রীসে বিদ্রোহ শুরু হয়। আলেক্সান্দার কঠোর হস্তে বিদ্রোহ দমন করেন। আনুমানিক ৬০০০ বিদ্রোহীকে হত্যা করা হয় এবং ৩০,০০ হাজার বন্দিকে দাস হিসেবে বিক্রি করা হয়। আলেক্সান্দার এর শিক্ষক এরিস্টটল তাকে শিক্ষা দিয়েছিলেন সকল পারস্যসহ সকল বর্বর জাতি একমাত্র গ্রীসের দাস হিসেবে থাকার যোগ্য। আলেক্সান্দার গ্রীসের বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেন। 

আলেক্সান্দার পারস্য সম্রাট দারিয়ুসকে আইসুসের যুদ্ধে পরাজিত করেন। সেখানে বিপুল সংখ্যক পারস্যবাসী নিহত হয়। আলেক্সান্দার দারিয়ুসের স্ত্রীকে নিজের হারেমে নিয়ে আসেন এবং গর্ভবতী করেন। আলেক্সান্দারের হারেমে এশিয়ার সেরা ৩৬৫ জন্য সুন্দরী ছিলো। আলেক্সান্দার বছরের প্রতি রাতে একজন নতুন নারীর সাথে শয়ন করতেন। 

আলেক্সান্দার ভূমধ্যসাগরের পূর্ব তীর ধরে এগিয়ে চলেছেন। পথে উপসাগরীয় শহরগুলো দখল করছেন। যারা বাধা দিচ্ছে তাদের ধ্বংস করছেন। ইতিহাস প্রসিদ্ধ টায়ার নগরী নিজে থেকেই নতি স্বীকার করে নিলো। কিন্তু সেখানে তারা আলেক্সান্দারকে ধর্মীয় অনুষ্ঠান পালনে নিষেধ করলো। ফলে আলেক্সান্দার টায়ার নগরীর যোদ্ধা, নাগরিক সব এক কাঁতারে জবাই করতে লাগলেন। প্রার্থনাগৃহে আগুন লাগিয়ে তিনি নারী ও শিশুদের পুড়িয়ে মারলেন। মিলিটারিতে যোগ দিতে পারে এমন বয়সের ২০০০ পুরুষকে সাগরের তীরে দাঁড় করিয়ে হত্যা করা হলো। ৩০০০০ অধিক মানুষকে দাস হিসেবে বিক্রি করে দিলো। 

এরপর গাজার সকল পুরুষকে হত্যা করলেন। পারস্যের গভর্ণরকে একটি ক্যারিয়টের পেছনে বেঁধে মৃত্যু না হওয়া পর্যন্ত টানার আদেশ দিলেন।  আলেক্সান্দার মিসরের পথে চললেন। ফিলিস্তিনের ভিতর দিয়ে যাওয়ার সময় সে সামারিয়া শহর দখল করে এর নেতা ও পলাতকদের হত্যা করলেন। গুয়াংমেলা যুদ্ধে তিনি আবারো দারিয়ুসকে পরাজিত করে ব্যাবিলন দখল করে নিলেন। ব্যাবিলন তখন মধ্যপ্রাচ্যের সব থেকে সমৃদ্ধ, ধনী এবং নয়নাভিরাম শহর। শিল্প, কলা, সাহিত্যে সে তখন বিশ্ব সাংস্কৃতির প্রাণকেন্দ্রে পরিণত হয়েছে। এই শহরে পাঁচ সপ্তাহ ব্যাপী আকেক্সান্দারের সৈন্যরা আমোদ প্রমোদ ব্যাভিচারে মেতে থাকল। ইংরেজীতে একটা টার্মস আছে, ওরগি। যেটার মানে দাঁড়ায় দলবদ্ধ ভাবে যৌনাচার। পাঁচ সপ্তাহের ওরগি শেষে আলেক্সান্দার পারস্যের রাজধানী পারসেপোলিশের পথে পা বাড়ালেন। আলেক্সান্দার শহরটি দখল করে জ্বালিয়ে দিলেন। খুব সম্ভবত সে সময় তিনি মাতাল ছিলেন। 

আলেক্সান্দার পলাতক দারিয়ুসকে ধাওয়া করা অব্যাহত রাখলেন। দারিয়ুস রাজ্য রানী সব হারিয়ে প্রাণ বাঁচাতে ছুটে চলেছে। রক্তনেশায় মত্ত আলেক্সান্দারও ছুটে চলেছেন। পথে যেই পড়ুক তাদের সে হত্যা করতে থাকল। একসময় দারিয়ুস খুন হয়ে গেলেন। আলেক্সান্দার এবার দারিয়ুসের হত্যাকারীকে হত্যা করতে ছুটলেন। একসময় বেসাস আলেক্সান্দারের হাতে ধরা পড়লেন। বেসাসের নাক কান কেটে নেয়া হল। তারপর তাকে হত্যা করা হলো। 

আলেক্সান্দার পুর্বের পথে ভ্রমনের সময় তার বিশ্বস্ত সেনাপতি ও অন্তরঙ্গ বন্ধু ক্লেইতাসকে মদ্যপ অবস্থায় খুন করে। ক্লেইতাসের সাথে আলেক্সান্দারের যৌন সম্পর্ক ছিলো। আলেক্সান্দার তার সেনাবাহিনীর ভিতর শুদ্ধি অভিযান চালনা করলেন। যারা তার নির্দেশ এক বাক্যে মানতে নারাজ তাদের সনাক্ত করলেন। সেনাবাহিনীতে তার পিতার অনুসারী সৈন্যদের আলাদা করলেন। আলেক্সান্দার নিজ সৈন্যদের আগত পত্রাদি পড়া শুরু করলেন। অভিযুক্ত সৈন্যাদের উপর ব্যাপক নির্যাতন চালানো হলো, পাথর ছুড়ে হত্যা করা হলো। 

আলেক্সান্দার এবার ভারতবর্ষের পথে পা বাড়ালেন। পথিমধ্যে যত শহর পড়ল আলেক্সান্দার সব দখল করে এগিয়ে চললেন। আলেক্সান্দার আসাসিনের রাজধানী মাসাজ্ঞাতে পৌছে সাত সহস্র ভারতীয় যোদ্ধাকে  আদেশ করলেন তার সেনাবাহিনীতে যোগ দিয়ে স্থানীয় রাজাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধে ঝাপিয়ে পড়তে। কিন্তু ভারতীয়রা এই আদেশ উপেক্ষা করলেন। ফলশ্রুতিতে আলেক্সান্দার স্ত্রী-সন্তান সহ তাদের সবাইকে হত্যা করলেন। 

ঝিলম নদীর তীরে সাজ সাজ যুদ্ধ রব। আলেক্সান্দার এখানে ভারতীয় রাজা পুরুর সাথে যুদ্ধ করে পরাজিত করেন। যুদ্ধে বিপুল সংখ্যক ভারতীয় মারা যায়। ঐতিহাসিকেরা বলে থাকেন মৃতের সংখ্যা ১২,০০০ থেকে ২৩,০০০ এর মধ্যের কোন সংখ্যা হবে। এই যুদ্ধে রাজা পুরুর দুই পুত্র নিহত হন।

বিখ্যাত বাঙালি ঐতিহাসিক ড. নীহাররঞ্জন রায় এর লিখেছেন- আজ এ-তথ্য সুবিদিত যে, ঔগ্রসৈন্যের সমবেত প্রাচ্য-গঙ্গারাষ্ট্রের সুবৃহৎ সৈন্য এবং তাহার প্রভূত ধনরত্ন পরিপূর্ন রাজকোষের সংবাদ আলেকজান্দারের শিবিরে পৌছিয়াছিল এবং তিনি যে বিপাশা পার হইয়া পূর্বদিকে আর অগ্রসর না হইয়া ব্যাবিলনে ফিরিয়া যাইবার সিদ্ধান্ত করিলেন, তাহার মূলে অন্যান্য কারণের সঙ্গে এই সংবাদগত কারণটিও অগ্রাহ্য করিবার মত নয়।
  
আলেক্সান্দার সৈন্য নিয়ে বিয়াস নদীর অভিমুখে যাত্রা করলেন। কিন্তু তার সৈন্যরা বেঁকে বসলো। তারা আর সম্মুখে অগ্রসর হতে রাজী হতে সম্মত হলো না। দীর্ঘদিন প্রবাসে অভিযান চালানোর পর তারা গৃহকাতর হয়ে পড়েছে। আলেক্সান্দার তার সৈন্যদের আশ্বস্ত করলেন আর কিছুটা অগ্রসর হলেই সামনে পূর্ব সাগর যেখানে পৃথিবীর শেষ প্রান্ত বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। তার পরে আর দেশ নেই। তারা এগিয়ে গেলো। কিন্তু সামনে ছড়িয়ে আছে উত্তর ভারতীয় মরুভূমি আর হিমালয়ের বিশাল পর্বত মালা। 

আলেক্সান্দারের সাম্রাজ্য এখন এতটাই বিস্তৃত হলো যা আগে কখনো কোন পারস্য সম্রাটের হয়নি। এমনকি গ্রীক পুরানে বর্নিত নায়ক বা দেবতাদের সাম্রাজ্য এত বড় ছিলোনা। আলেক্সান্দারকে তাই বলা অর্ধ পৃথিবীর ইশ্বর। এবার ফেরার পালা। কিন্তু আলেক্সান্দার যে পথে এসেছিলেন সে পথে না ফিরে তার সৈন্যদের নিয়ে দক্ষিণ দিক দিয়ে অগ্রসর হতে লাগলেন। পথে যে শহরগুলো পড়লো সেই শহরের গভর্নরদের হত্যা করতে লাগলেন। আর যে সকল ব্রাম্মণরা তার পথে বাঁধা সৃষ্টি করার চেষ্টা করলো তাদের ফাঁসিতে ঝুলিয়ে হত্যা করলেন। মুলতান শহরে আলেক্সান্দার কিছুটা আঘাত প্রাপ্ত হন। সেজন্য আলেক্সান্দার মুলতান শহরের শেষ মানুষটিকে পর্যন্ত হত্যা করেন। 

আলেক্সান্দার তার সেনাদের নিয়ে মারকান উপকূল ধরে এগিয়ে চললেন, গেডরোশিয়ান মরুভূমি পার হওয়ার সময় তার সেনাবাহিনীর সৈন্য, মহিলা ও শিশুদের প্রায় অর্ধেক মৃত্যুমুখে পতিত হলো। আলেক্সান্দার পারস্যে ফিরে এলেন। সেখানে একটি গণবিবাহের আয়োজন করা হলো। আলেক্সান্দারের আশি জন কমান্ডার পারস্যের রাজকন্যাদের পাণি গ্রহন করলেন। আলেক্সান্দার নিজেই তিনজন রাজকন্যাকে বিয়ে করলেন। এই সময়ে তিনি গ্রীকের বিভিন্ন শহর এবং রাজ্যগুলোতে তাকে ঈশ্বর হিসেবে ঘোষণা করতে নির্দেশনা পাঠালেন। ইতিহাসের পাতায় তখন সময় ৩২৪ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। 

৩২৩ খ্রিষ্টপূর্বাব্দ। আলেক্সান্দারের বয়স ৩২ বছর। তখন তিনি ব্যাবিলনে। মদ আর নারী তার নিত্য সঙ্গী। একটানা দশদিন অনবরত মদ্যপানের ফলে তিনি দ্বিতীয় নেবুচাদনেজারের প্রাসাদে মৃত্যুবরণ করেন।  মৃত্যুমুখে পতিত হন। ঈশ্বরত্বের দাবিদার এভাবে শেষ হয়ে গেলেন। ধারণা করা হয় তার পানপাত্রে বিশ মিশিয়ে দেয়া হয়েছিলো। যোগ্য উত্তরাধিকারী না থাকায় আলেক্সান্দারের মৃত্যুর সাথে সাথে তার মহা সাম্রাজ্য ভেঙে টুকরো টুকরো হয়ে গেলো। যুদ্ধ-বিগ্রহের কারণে মেসিডোনিয়ার বেশিরভাগ পুরুষ নিহত হয়। আর সেজন্য মেসিডোনিয়া কখনোই ইতিহাসের পাতায় দ্বিতীয়বার মাথা উচু করে দাঁড়াতে পারে নাই। 


লাইক এন্ড শেয়ারঃ :
 

Post a Comment

 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।