খানজাহান আলীর মাজারে

অনেকদিন থেকে লিখব লিখব ভাবছি, কিন্ত লেখা হয়ে ওঠে না আজ কয়েক বছর পর স্মৃতি হাতড়ে লিখতে বসলাম বাগেরহাট ভ্রমনের ইতিবৃত্ত আমি সেভাবে লেখালেখি করিনা। মাঝে মাঝে লেখার সখ জাগে। কিন্তু আলসেমী করে আর লেখা হয়ে ওঠে না। তখন আমি ইন্টার সেকেন্ড ইয়ারে পড়ছি খুলনা পাবলিক কলেজে থাকি দৌলতপুরের পাবলা তিন দোকানের মোড়ের এদিকের একটা মেসে। ২০০৩ সাল আমার একজন কাছের মানুষ তপনদা তপনদার সাথে পরিচয় হয় চালনার পশুর নদীর শাখা নদী চুনকুড়ি নদীর পাড়ে। কলেজের ছুটিতে বাড়ী গেছি। আমি প্রতিদিনের মতই একা বসে ছিলাম নদীর পাড়ে। পাতলা ছিপছিপে একটা ছেলে বাদাম খেতে খেতে আমার দিকে এগিয়ে আলো। বাদামের প্যাকেট বাড়িয়ে দিয়ে বললো, নেন বাদাম খান। আমি বলেছিলাম না না ঠিক আছেতারপর একটু একটু কথা বলতে বলতে আমাদের সম্পর্কটা বন্ধুত্বে রূপ নিলো। যদিও সে আমার থেকে বয়সে বেশ বড় ছিলো কিন্তু হাইটের জন্য আমাকেই বড় লাগত। তপনদা কুমিল্লার ছেলে এখানকার সেটেলমেন্ট অফিসে চাকরী করেন তিনি একদিন প্লান করলেন বাগেরহাটে ষাট গম্বুজ মসজিদ দেখতে যেতে হবে আমিও কখনো বাগেরহাটে যাই নাই। সানন্দে রাজী হলাম। ছুটি শেষ হয়ে যাওয়ায় দৌলতপুরে ফিরে এলাম শুক্রবারে আময়ার কলেজ এবং তপনদার অফিস ছুটি থাকে। এক শুক্রবারে প্লান আটলাম কথা ছিলো দুজন প্রথমে এক হবো গল্লামারি বাসস্ট্যান্ডে। চালনা থেকে খুলনা আসতে দাদা ১১টা বাজিয়ে দিল আমি সেই সকাল ৮টা-সাড়ে ৮টা থেকে তার জন্য গল্লামারি বাস স্ট্যান্ডে দাঁড়িয়ে আছি আমার ফোন ছিলোনা তাই এখনকার মত ঝটপট যোগাযোগ ও করা যেত না

আমরা রিকশা করে রূপসা ফেরীঘাটে এলাম খানজাহান আলী সেতু চালু হওয়ার আগে এই ফেরীঘাট এলাকা জমজমাট ছিলো গাড়ী আর মানুষের ভীড়ে জায়গাটা রাতদিন সরগরম থাকত।  আমরা ট্রলারে করে নদী পার হয়ে ওইপারে গেলাম  বাগেরহাটের বাসে উঠলাম আকাশ আঁধার করে মেঘেরা ছুটে এল ভয় পেলাম ঝড় বৃষ্টি এসে আমাদের বেড়ানোর আনন্দটাই না মাটি করে দেয় বৃষ্টি নামল না বাতাসে বৃষ্টির গন্ধ ভেসে এল বাসে উঠলে আমি সবসময় জানালার পাশের সিটটা দখলের মতলবে থাকি যথারীতি আজকেও আমার আশা পূরন হয়ে গেল তখন পর্যন্ত আমার বাইরের জেলায় বেড়ানোর অভিজ্ঞতা খুব কম একমাত্র ক্লাস এইটে পড়ার সময় কুষ্টিয়ার শিলাইদহে বেড়ানোর স্মৃতিটা জ্বলজ্বল করে মনের মাঝে আমাদের খুলনার তুলনায় বাগেরহাটের এই এলাকাটা অনেক সবুজ ঘন গাছপালা আমার সামনে মেলে ধরে অজানা সুন্দর এক পৃথিবী আমি মুগ্ধ চোখে আকাশ দেখি, সবুজ নিবিড় গাছেদের সারি দেখি

বাসটা কিছুদুর যেতেই লোকে পরিপূর্ণ হয়ে গেলো। লোকাল বাসে ঠাসা ভীড় ঝিরিঝিরি বৃষ্টি হচ্ছে বাইরে বাসের যাত্রীরা বৃষ্টির ছাট আসছে বলে সবগুলো জানালার গ্লাস টেনে দিল ঘামের গুমোট গন্ধে ভেতরের বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে আমার খুব ইচ্ছে করছিল জানালার গ্লাস সরিয়ে মুখে বৃষ্টির পরশ মাখতে তপনদার ঠান্ডার সমস্যা তিনি খুলতে দিলেন না দুপুর একটার কিছু আগে আমরা মাজারে পৌঁছে গেলাম যদিও ষাটগম্বুজ মসজিদ আগে পড়ে কিন্তু আমাদের প্লানে আগে দিঘী দেখার কথা মাজারে ঢোকার পথটা তুলনামূলকভাবে বেশ অপ্রশস্ত দুইপাশে আগরবাতি, মোমবাতি ওয়ালাদের দোকান পথটাকে সংকীর্ণ করে রেখেছে তারা ডাকাডাকি করে কান ঝালাপালা করে দিল আমরা সবকিছু উপেক্ষা করে সামনে এগিয়ে যেতে থাকি আমাদের কোন মানত নাই। আর ইসলাম এই ধরনের কোন মানত সমর্থন করে বলে আমার জানা নাই। মোমবাতি, আগরবাতি কিছুই কিনলাম না। আমরা এসেছি বেড়ানোর আনন্দ নিয়ে বৃষ্টিটা ধরে গেছে বলে রক্ষে

মাজারের গেটে গেলাম মেটাল ডিটেক্টর হাতে নিয়ে বিরস মুখে বসে আছে একজন গেটের কাছে ভাবলাম আমাদের বুঝি চেক করবে তখনও আমি কোথাও মেটাল ডিটেক্টর নিজের চোখে কিভাবে ব্যবহার করা হয় তা দেখিনি আমি কৌতূহলী হলাম কিভাবে মেটাল ডিটেক্টর দিয়ে চেক করে দেখার জন্য। কিন্তু আমাদের চেক করার ব্যাপারে লোকটার কোন আগ্রহ দেখলাম না শুধু মুখ তুলে জিজ্ঞেস করম কোন জায়গা থেকে আসছি, কোন মানত কিনা? বুঝলাম লোকটার পান্ডা টাইপের কিছু গয়াকাশির পান্ডাদের কথা তখন আমি গল্পের বই পড়ে জেনে গেছি তাই বুঝতে অসুবিধা হল না মাজারের কাছে পৌঁছে গেছি কিছুটা রোমাঞ্চিত হলাম ছোটকাল থেকে জেনে এসেছি এই দিঘীর গল্প নানীজানের অতি ভক্তির জায়গা এটা বিয়ের দশ বছর পরেও যখন বাচ্চা হলনা তখন নানী এসেছিলেন এই দীঘিতে মানত করতে নানীর কোলজুড়ে আসেন আম্মা। তাই এই দিঘীর প্রতি, মাজারের প্রতি নানীর অঘাধ বিশ্বাস। জীবনের অনেক বিপদে আপদে তিনি এই দিঘীতে ছাগল মানত করেছেন

ইতিহাসে খানজাহান আলী খলিফাতাবাদের শাসক হিসেবেই প্রসিদ্ধ বাগেরহাট-খুলনার পুরাতন নাম ছিল খলিফাতাবাদসুলতান নসিরউদ্দীন মাহমুদ শাহের (১৪৩৫-৫৯) আমলে খান আল-আজম উলুগ খানজাহান সুন্দরবনের কোল ঘেঁষে খলিফাবাদ রাজ্য গড়ে তোলেন। খানজাহান বৈঠক করার জন্য একটি দরবার হল গড়ে তোলেন, যা পরে ষাট গম্বুজ মসজিদ হয়। তুঘলকি ও জৌনপুরী নির্মাণশৈলী এতে সুস্পষ্ট। কিন্তু প্রচলিত লোকবিস্শ্বাসে খান জাহান হচ্ছেন আল্লাহর একজন অলি যিনি জ্বীন পরীদের দিয়ে এক রাতের মধ্যে এই দিঘি খনন করেনইতিহাসের কচকচানি পরে করা যাবে আগে আমি নিজের চোখের ক্ষুধাটাই মেটাই আমার মূল আগ্রহ এই দিঘীটা নিয়ে তাই পীরের মাজার পাশ কাটিয়ে ছুটে গেলাম দীঘির কাছে আমার চোখের সামনে ফুটে উঠল বিশাল জলরাশি ঝিরি ঝিরি বৃষ্টি আবার শুরু হয়েছে দীঘির অপর পাশ ঘোলাটে হয়ে দীঘির বিশালতাকে আরো বেশী করে ফুটিয়ে তুলেছে আমার নবীন চোখ এই প্রথম এত বিশাল কোন জলরাশিকে থমকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখল মুগ্ধ, আমি মুগ্ধ বিমুগ্ধ চোখে দেখছি দীঘির বিশালতা। দিঘীতে নামার সিড়িটা মোজাইক করা আমি সিড়িতে বসে পানিতে পা দুবিয়ে বসে থাকলাম অনেকক্ষন অনেক লোক গোসল করছে গোছলের কথা ভূলে গেছিলাম। না হলে বাড়তি পোষাক আনা যেত। আমাদের কাছে বাড়তি পোষাক নাই খুব আফসোস হল হাতের অঞ্জলী ভরে পানি নিলাম। কমেক চুমুক পানি খেলাম দিঘী থেকে এই দিঘীর পানিকে অনেকেই পবিত্র বলে গন্য করেন হিন্দু-মুসলমান দের অনেকেই রোগমুক্তির আশায় দিঘীর জলে গোসল করতে আসে পবিত্র জলে রোগের জীবানু কে ধুয়ে ফেলে বিশুদ্ধ জীবন ফিরে পেতে চায় বিশ্বাস এক বিচিত্র জিনিস। বিশ্বাসের জোরে কেউ গরুকে, কেউ পাথরকে, কেউ অদৃশ্য সত্বাকে সৃষ্টিকর্তা মানে। আবার কিছু কিছু মানুষ বিশ্বাসের জোরেই মানুষ সৃষ্টিকর্তাকে অস্বীকার করে।

দিঘীতে কালাপাহাড়, ধলাপাহাড় নামে দুইটি মিষ্টি পানির কুমির ছিল সেই খানজাহান আলীর সময় থেকে ধলাপাহাড় মারা গেছে কালাপাহাড় তখনো জীবিত মনের মধ্যে ইচ্ছে ছিল কালাপাহাড় কে দেখব বিশাল যে কুমিরের গল্প শুনেছি নানীর কাছে সেই কুমির কে দেখার ব্যাকুল আগ্রহ নিয়ে জলের দিকে চেয়ে থাকলাম মাজারে খাদেম রয়েছে প্রচুর একজন চিৎকার করে মুরগী বিক্রি করছে আমাদেরকেও মুরগী কেনানোর জন্য খুব জোরাজুরি করল শীতকালে যেখানে বসে কালাপাহাড় রোদ পোহায় সেই জায়গাটা দেখলাম কিন্তু কালাপাহাড়ের দেখা নাই পুকুরের পানিতে ডুব মেরে আছে সে। পানির মধ্য কিছুটা একটা ঘাঁই দিয়ে গেল খুব আশা করছি , এখনি কালাপাহাড় ভূস করে ভেসে উঠবে ঘাটের বাম দিকে পুরাতন ঘাটটি অবস্থিত ঐ ঘাটটি এখন শুধুমাত্র মহিলাদের জন্য ব্যবহার করা হয় আর পুরুষদের জন্য এই ঘাটটি

আমার এখানে বসে থাকতে ভালো লাগছে। কিন্তু তপনদার পিড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত উঠতে হল তার দাবি এক জায়গায় আর কতক্ষন বসে থাকব এখনো দেখার অনেক কিছু বাকি আছে দিঘি, দীঘি, দিঘী এই সব কয়টি বানানে বাংলায় দিঘি বানান করা হয় আমি জানিনা কোনটা সঠিক তাই ঘুরে ফিরে সবগুলো বানানই ব্যবহার করলাম মাজারের দিকে এগিয়ে এলাম মাজার ভবনটি একটি একগম্বুজ বিল্ডিং গায়ে মুঘল আমলের টেরাকোটা করা আমি স্থাপত্য বিদ্যার তেমন কিছু বুঝি না তাই সেদিকে কিছু দেখিও নাই বলছি ও না মাজারের ভিতর ঢুকলাম মাজার জিয়ারতের নিয়ত করলাম
হযরত খানজাহান আলী (রাঃ) (জন্ম ১৩৬৯ - মৃত্যু অক্টোবর ২৫, ১৪৫৯) ছিলেন একজন মুসলিম ধর্ম প্রচারক এবং বাংলাদেশের বাগেরহাটের স্থানীয় শাসক। তাঁর অন্যান্য নামের মধ্যে রয়েছে উলুঘ খান, খান-ই-আজম ইত্যাদি।

হযরত উলুঘ খানজাহান আলী (রাঃ) ১৩৬৯ খ্রিস্টব্দে দিল্লীতে এক সম্ভ্রান্ত পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম আকবর খাঁ এবং মাতার নাম আম্বিয়া বিবি। খানজাহান আলীর প্রাথমিক শিক্ষা তার পিতার কাছে শুরু হলেও তিনি তার মাধ্যমিক শিক্ষা গ্রহণ করেন দিল্লীস্থ বিখ্যাত ওয়ালি এ কামিল পীর শাহ নেয়ামত উল্লাহর কাছে। তিনি কুরআন, হাদীস, সুন্নাহ ও ফিকহ শাস্ত্রের উপর গভীর জ্ঞানার্জন করেন।

খানজাহান আলী ১৩৮৯ খ্রিস্টাব্দে তুঘলক সেনা বাহিনীতে সেনাপতির পদে কর্ম জীবন আরম্ভ করেন। অতি অল্প সময়ের মধ্যেই প্রধান সেনাপতি পদে উন্নীত হন। ১৩৯৪ এ মাত্র ২৬/২৭ বছর বয়সে তিনি জৈনপুর প্রদেশের জাবিতান (গভর্ণর) পদে যোগ দেন। পরবর্তীতে সুলতান খানজাহানের নেতৃত্বে ৬০,০০০ সুশিক্ষিত অগ্রবর্তী সেনাদল সহ আরও দুই লক্ষ সৈন্য নিয়ে বাংলা আক্রমণ করলে রাজা গণেশ দিনাজপুরের ভাতুরিয়াতে আশ্রয় নেন। ১৪১৮ খৃষ্টাব্দে খানজাহান যশোরের বার বাজারে অবস্থান নেন এবং বাংলার দক্ষিণ পশ্চিম অংশে ইসলাম ধর্ম প্রচার ও প্রসার আরম্ভ করেন।

খানজাহানের প্রথম স্ত্রীর নাম সোনা বিবি। কথিত আছে সোনা বিবি ছিলেন খানজাহানের পীর নূর-কুতুবুল আলমের একমাত্র কন্যা। খানজাহানের দ্বিতীয় স্ত্রী রূপা বিবি ওরফে বিবি বেগনী ধর্মান্তরিত মুসলমান ছিলেন। খানজাহান আলী তাঁর দুই স্ত্রীর নাম অনুসারে সোনা মসজিদ এবং বিবি বেগনী মসজিদ নামে মসজিদ নির্মাণ করেন।

হযরত খানজাহান আলী (রাঃ) অক্টোবর ২৫, ১৪৫৯ তারিখে (মাজারশরীফের শিলালিপি অনুযায়ী ৮৬৩ হিজরী ২৬শে জিলহাজ্ব) ষাট গম্বুজ মসজিদের দরবার গৃহে এশার নামাজ রত অবস্থায় ৯০ বছর বয়সে মৃত্যুবরণ করেন।
প্রতি বছর চৈত্র মাসের পূর্ণিমার সময় খান জাহান আলীর মাজারে ওরস অনুষ্ঠিত হয় এবং লক্ষাধিক লোক তাতে সমবেত হয়।

মাজার জিয়ারত করে বেরিয়ে এলাম। এবার ষাটগম্বুজ মসজিদ দেখতে যাওয়ার পালা।


(আমি বাগেরহাট বেড়াতে যাই ২০০৩ সালে। আর এই লেখাটি লিখি ২০০৯ সালে।)





লাইক এন্ড শেয়ারঃ :
 

Post a Comment

 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।