চশমা চোখে


মানুষের শরীরের প্রধানতম অঙ্গের একটি চোখ। প্রাচীনকাল থেকেই মানুষ চোখের নানাবিধ রোগে ভুগছে। চোখের প্রধানতম রোগ হচ্ছে চোখের জ্যোতি কমে যাওয়া। দূরের দৃষ্টি স্পষ্টভাবে দেখতে না পাওয়া এই রোগের পুঁথিগত নাম ক্ষীনদৃষ্টি। আবার কিছু লোক আছে যারা দূরের জিনিস ভালো দেখতে পায় কিন্তু কাছের জিনিস দেখতে পায় না। অনেককেই দেখবেন কোন কিছু পড়ার জন্য চোখ থেকে দূরে সরিয়ে পড়ছে। আর বেশীরভাগ বাঙালী চল্লিশের পরে চোখে কম দেখা শুরু করে। বয়সের কারণে এই রোগ হয় বলে এটাকে ‘চালশে’ও বলা হয়। চোখের রোগ নিয়ে বেশী কথা নয়। আজকের আলোচ্য বিষয় চশমা আবিষ্কার।

মানুষ প্রথমে কাঁচ আবিষ্কার করে , তারপর লেন্স। খ্রিষ্টপূর্ব ৩০০ সালের মানুষ কাঁচের লেন্স ব্যবহার করত বিবর্ধক হিসেবে, আগুন জ্বালাতে। মধ্য গগনের সূর্য রশ্মিকে পূর্ন আভ্যন্তরীন প্রতিফলনের মাধ্যমে তারা আগুন জ্বালাত শুকনো পাতায়, জমিয়ে রাখা খড়ে। আতশ কাঁচ আবিষ্কারের আগে মানুষ আগুন জ্বালাত চকমকি পাথর ঠুঁকে অথবা শুকনো দুখন্ড কাঠ ঘঁষে। সামান্য আগুন জ্বালাতে তাদের হাতে কড়া পড়ে যেত।

১২৮০ সালে ইতালির ফ্লোরেন্সে প্রথম চোখের চশমা আবিষ্কার করেন আলেস্যান্দ্রো ডেল্লা স্পিনা এবং স্যালভিনো ডেলগি আরমাটি। আরমাটি আলোর প্রতিসরন বা রিফ্রাকশান নিয়ে গবেষণা করছিলেন। এতে তার চোখে কিছুটা সমস্যা হয়। তিনি এক পর্যায়ে আবিষ্কার করেন দুই খন্ড কনভেক্স লেন্স বা উত্তল লেন্সের ভিতর দিয়ে তাকালে বেশ ভালো ভাবে দেখা যায়। উত্তল লেন্স বস্তুর আকার বিবর্ধিত করে দেখতে সাহায্য করে। তিনি ক্ষীনদৃষ্টির চিকিৎসায় উত্তল লেন্স ব্যবহার করতে পরামর্শ দিতে শুরু করলেন। ১৪০০ সালের দিকে ক্ষীনদৃষ্টির চিকিৎসায় উত্তল লেন্স পুরোদমে ব্যবহার হতে লাগলো। পোপ দশম লিও চশমা পরিধান করতেন। ১৫১৭ সালে রাফালেলের আঁকা প্রতিকৃতিকে দেখা যায় পোপ লিও দশমের চোখে চশমা। চার্চ প্রথম দিকে বৈজ্ঞানিক আবিষ্কারের বিপক্ষে ছিলো। তারা বিজ্ঞানের আবিষ্কারকে সহজে মেনে নিত না। এখন যেমন আধাশিক্ষিত মুসলিম হুজুররা বিজ্ঞান নিয়ে কটাক্ষ করে তখনকার দিনে চার্চের শিক্ষিত যাজকেরা সেটাই করত। কোপারনিকাসকে চার্চ পুড়িয়ে মারে। বৃদ্ধ গ্যালিলিও গ্যালিলিকে তারা নতজানু হয়ে চার্চের কাছে ক্ষমা প্রার্থনা করতে বাধ্য করে। কেন জানেন? তারাই প্রথম বলেছিলেন সূর্য নয় পৃথিবী ঘোরে।

প্রথম দিকে কোয়ার্টজ কাঁচকে ঘষে উজ্জ্বল করে চোখের চশমা তৈরী করা হত। ষোড়শ শতাব্দীতে কাঁচশিল্পে ব্যাপক উন্নতি সাধিত হয়। ফলে চশমা শিল্পেও তার হাওয়া লাগেসাধারন কাঁচ থেকে চশমা তৈরী শুরু হলো। আর কাঁচ তৈরী হয় বালি থেকে। বাংলাদেশের বালিতে প্রচুর পরিমানে আয়রন থাকায় ভালোমানের কাঁচ উৎপাদন সম্ভব নয়। আয়রনের কারণে উৎপাদিত কাঁচ নীলচে রঙ ধারন করে। চট্ট্রগ্রামের ওসমানি গ্লাস ইন্ডাসট্রিতে চাঁদপুরের বালি ব্যবহার করে কাঁচ উৎপাদন করা হয়। বাকি কোম্পানীগুলো চীন থেকে কাঁচ শিল্পের কাঁচামাল বালি আমদানি করে থাকেন।











উত্তল এবং অবতল লেন্স মিলিয়ে যে চশমা প্রস্তুত করা হয় তাকে বলা হয় বাইফোকাল লেন্স। এই চশমা ব্যবহার করে কাছে দেখা ও দূরে দেখা দুই ধরনের সমস্যার সমাধান করা সম্ভব। ১৭৬০ সালে আমেরিকার উদ্ভাবক বেঞ্জামিন ফ্রাংকলিন বাইফোকাল চশমা আবিষ্কার করেন।


খুব বেশী দিন আগের কথা নয়। বাঙালী শিক্ষিত সমাজের সাজের পোষাকে থাকত কাঁধে ভাঁজ করা চাদর, চোখে চশমা, হাতে হাত ঘড়ি, পকেটে কলম। চশমা এখন বিলাসিতার সামগ্রী নয়। প্রয়োজনের তাগিদেই আমাদের কাউকে না কাউকে চশমা পরতে হয়। আমার বংশের পূর্বপুরুষদের মধ্যে দুইটি রোগের প্রকোপ বেশি। তাদের প্রায় সবাই কেউ চোখের রোগে ভূগেছেন অথবা কানে কম শুনেছেন। আমার দাদারা ছিলেন ছয় ভাই বোন। তাদের তিনজনের ছিলো চোখের সমস্যা আর দুইজন কানে কম শুনতেন। দাদাজনের দুই চোখেই ছানি অপারেশন করা হয়েছিলো। আব্বা অনেক দিন হলো চশমা ব্যবহার করছেন। আম্মা বই পড়ার সময় চশমা ব্যবহার করেন। আমি কতদিন চশমা থেকে দূরে থাকতে পারব জানি না। আমার জন্য দোয়া করবেন।





লাইক এন্ড শেয়ারঃ :
 

+ টি মন্তব্য + 1 টি মন্তব্য

Rahul biswas
October 7, 2011 at 2:50 PM

Jhakkas

Post a Comment

 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।