১৫.০৮.২০০৭
আজ পনের আগস্ট। ১৯৭৫ সালের এই দিনে বাংলার মহানায়কদের মধ্যে উজ্জ্বলতম
নক্ষত্র যে জন সেই তিনি বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সপরিবারে ঘাতক খুনীদের হাতে
নিহত হন।
ক্যাম্পাসে পৌঁছানোর কিছুক্ষণ পরে ফরিদ ভাই আমার বুকে শোকচিহ্ন কালো
ব্যাজ এটে দিলেন। আমি কোন ছাত্র সংগঠন করিনা । আমি ছাত্ররাজনীতি সমর্থন করিনা। আমার
ব্যক্তিগত মতে ছাত্ররাজনীতির কোন ভালো দিক নেই। আছে কিছু সোনালী অতীত। যার স্মৃতি রোমন্থন করেন রাজনীতিবীদেরা। তবুও আমি
ব্যাজ লাগালাম। কারণ আমি বিশ্বাস করি সকল দলমত নির্বিশেষে মুজিব শ্রদ্ধা এবং
সন্মান পাওয়ার মতই একজন ব্যক্তি।
বন্ধু মুজাহিদ অন্য একটি ছাত্র সংগঠন করে। সেও কালো ব্যাজ নিল বুকে।
আমার খুব ভালো লাগল। পারস্পরিক বোঝাপড়া এবং সহমর্মিতা গণতাণ্ত্রিক বাংলাদেশ গড়ার
প্রধান হাতিয়ার। আজাহার এবং সেলিম আমার জানামতে কোন দল করে না। কিন্তু ওরা ব্যাজ
নিল না। ব্যাজ নিলে নাকি ওদের সমস্যা হবে। এদের আর কি দোষ দিব। আসল সমস্যার বীজ তো
অন্য জায়গায়।
অনেক ছাত্রলীগপন্থী বন্ধু দেখলাম ব্যাজ লাগিয়ে সেমিনার রুমে চুপচাপ বসে
আছে। তারা হয়তো সেই সকল স্যারের সামনে পড়তে চায়না যারা অন্য দলের পতাকাবাহী।
শিক্ষকেরা কেন প্রকাশে রাজনীতি করবেন! বিভেদের মন্ত্র কী আমরা এখানেই পাচ্ছিনা?
আমার মনে হয়না একটা কালো ব্যাজ লাগালেই আমি আওয়ামী লীগার হয়ে যাব। তাই
বুকে কালো ব্যাজ এঁটে সারা ক্যাম্পাস ঘুরে বেড়ালাম। বশির স্যারের সাথে দেখা হল।
স্যার বড় একটা ব্যাজ লাগিয়েছেন।
ডায়না চত্ত্বর দিয়ে হাঁটছি হঠাৎ পিছন থেকে
একজন বলল, “ভাই শুধু ব্যাজ লাগিয়ে
ঘুরবেন, আর কিছু করবেন না?”
আমাদের মানসিকতায় কত সমস্যা!
২ টার বাসে বাসায় ফিরব। বাসে সিট ধরে বসে
আছি। মোবাইল টা ভাইব্রেশানে কেঁপে উঠল। অনেকদিন পর বিশ্বজিতের ফোন এল। ওর গলাটা
ফোনের ভাইব্রেশানের চেয়ে আরো বেশী কাঁপছে। বিশ্বজিত কথা একটু বেশী বলে। কিন্তু আজ
এক কথাতেই ওর সব কথা ফুরিয়ে গেল। আজ সকালে আমাদের বন্ধু তরুন আমাদের ছেড়ে চিরতরে
চলে গেছে।
মনে হল মাথার মধ্য দিয়ে ২২০ ভোল্ট বিদ্যুতের প্রবাহ বয়ে গেল। এই প্রথম
আমাদের কোন বন্ধু আমাদের ছেড়ে চলে গেল। সে রাগ করে বাড়ী ছেড়ে যায়নি তবু বলছি
অভিমানী বন্ধু তুই ফিরে আয়। আমরা সবাই বুক পেতে বসে আছি তোর জন্য। কোন অভিমানে
স্মৃতির বোঝা আমাদের কাঁধে ফেলে একাকী চলে গেলি না ফেরার দেশে।
আমি আজ এতদিন পরেও বিশ্বাস করতে পারিনা তোর সাথে আর আমার দেখা হবেনা।
মনে হয় গরমের ছুটিতে চালনা গেলে আবার তোর সাথে দেখা হবে! প্রিয় বন্ধু আর একবার
ফিরে আয় তুই। দুনয়ন ভরে দেখি তোরে।
আর কোন খুঁনসুটি করব না দোস্ত।
আর পানিতে ফেলে দেওয়ার জন্য সিস্টার সুফলা’র কাছে নালিশ করে তোকে মার খাওয়াবো না। আর পরিমল স্যারের কাছে নালিশ
করবো না তোর নামে। টাইগার স্যার আর তোকে চোখ রাঙাবে না। ফিরে আয় তুই।
ফিরে আয় প্লিজ! অনুপ, বিশ্ব,
মাসুদ, শিমুল, ফকরুল, যশোদা, পুটু ( সুস্মিতা) , তুই আমি আমরা সবাই মিলে আবার
একসাথে কে,সি স্কুলের মাঠে আড্ডা দেব বিকেলের মৃদু আলোয়। ফিরে আয় তুই।
কেন বিধাতা আমাদের প্রার্থনা শুনলে না।
তারচেয়ে তুই বরং ফিরে আয়। ফিরে আয় তোর বাবা মায়ের বুকে।
ভারতে গেছিলি তুই ফিরে আসার
জন্য। কিন্তু ঘাতক ক্যান্সার তোকে ফিরতে দিলনা। মাঝে মাঝে জীবন কী নির্মম-নিষ্ঠুর
হয়ে ওঠে। তোকে আমরা সবসময় মনে করি। গরমের ছুটিতে শেষ দেখা হয়েছিল তোর সাথে। জীবনে
প্রথম ব্যাজ পরে শোক দিবস পালন তুই এভাবে সার্থক না করলে পারতিস দোস্ত! হায়রে
সোনালী ডানার চিল।
Post a Comment