মেহেরপুর যাওয়ার সিদ্ধান্ত হঠাৎ করেই নিতে হলো। আমার
নিজের কোন প্লান ছিলো না। বন্ধু ফারহানার ইচ্ছে হয়েছে সে মুজিবনগর বেড়াতে যাবে। ক্লাসে
অনেককে সে বোঝানোর চেষ্টা করেছে। কিন্তু এপ্রিলের এই গরমে কারোরই যাওয়ার আগ্রহ
দেখতে পেলাম না। ফারহানা শেষ পর্যন্ত আমাকে ধরে বসলো। ফারহানা সহজ সরল একটু
পাগলাটে টাইপের। আমি রাজি হই না। বলি বিয়ের পরে স্বামীর সাথে যেও। সেও নাছোড়
বান্দা। এই বছর শেষেই মাস্টার্স পরীক্ষা। তারপর চাকুরীজীবন, সংসার জীবন। কি হবে কে
জানে! হোক সে আমার ভালো বন্ধু, কিন্তু একটা মেয়েকে নিয়ে একলা যেতে মন সরছিলো না। ফারহানার
পীড়াপিড়িতে শেষ পর্যন্ত রাজী হলাম।
সকাল ছয়টায় বের হওয়ার কথা। ছাত্র জীবনের প্রতিটি
স্টেপ, বিদ্যালয়, উচ্চবিদ্যালয়, মহাবিদ্যালয়, বিশ্ববিদ্যালয় সব কটি ধাপে আমি
বরাবরই ছিলাম আর্লি রাইজার। হলের ছাদে পায়চারি করতে করতে অনেক দিন স্বাগত জানিয়েছে
ভোরের প্রথম সূর্যকে। মোবাইল ফোনে রবীন্দ্র সংগীত বাজিয়ে রেখে দিতাম এক পাশে।
ছাদের কার্নিশে বসা পায়রাগুলো বাকুম বাকুম করত। অদূরে মেহগনি বাগানে চড়ুই-শালিকের
কিচির মিচির রোজকার মত আজকেও শুরু হয়েছে। ঘড়িতে সবে পাঁচটা পনের বাজে। এলার্ম দিয়ে
রেখেছিলাম। গোছল সেরে রুমে আসতেই রুমমেট কামাল ভাই বলল, দেখেন ‘ভাই, কে আপনাকে ফোন
করেছিলো’। ফারহানার ফোন। আমি ব্যাক করতেই তার উচ্ছ্বসিত কন্ঠস্বর, ‘কোথায় তুমি?’
‘কেন এইতো রুম!’
‘বের হও’।
‘ছয়টায় না বের হওয়ার কথা’।
‘এখনি বের হও’।
‘আচ্ছা রেডি হয়ে আসছি। তুমি কোথায়?’
‘আমি বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটে’।
‘কি বলো! গেটে চলে এসেছো এত্ত সকালে! আমার কিন্তু
টাইম লাগবে’।
‘কেন! মেয়েদের মত তোমার আবার সাজুগুজু করার অভ্যেষ
আছে নাকি?’
‘হুম, লিপিস্টিক মাখাবো’।
‘ইয়ার্কি রাখো। আর ফোন রেখে জলদি রেডি হয়ে আসো। আমি
অপেক্ষা করছি’।
বিশ্ববিদ্যালয়ে মেয়েদের মধ্যে একমাত্র স্মৃতিকে আমি
তুই বলে সম্বোধন করতাম। বাকি মেয়েদেরকে তুমি বলা অভ্যেষ হয়ে গেছে। গেটের কাছে চলে
এসেছি। বসন্তের এই শেষ লগ্নে প্রশাসন ভবনের সামনের চত্ত্বরে কৃষচূঁড়ার লাল আর
সোনালুর হলুদ রঙে সকালটা আলো হয়ে আছে। এতক্ষন বসিয়ে রাখায় ভেবেছিলাম ফারহানার ঝাড়ি
খেতে হবে। কিন্তু আমাকে দেখেই সে উৎফুল্ল হয়ে উঠলো। বেড়ানোর আমেজে আছে সে।
বাসে ওঠার পরেও তার চনমনে ভাবটা কাটলো না। সারাক্ষণ
বকবক করে চলেছে। চোখের উপর তার ইয়া মোটা সানগ্লাসটা পরে আছে। আমি তাকে ফিসফিস করে
বলি, ‘কথা কম বললে হয় না। এটা ট্যুর বাস না। লোকাল বাস। বাকি প্যাসেঞ্জাররা না
আবার বিরক্ত হয়!’
সে অবলীলায় বলল, ‘হলে হোক। আমি তো ট্যুরে যাচ্ছি’।
বাসটা সেমি লোকাল। মাঝে মাঝে থামছে। যাত্রীরা নেমে
যাচ্ছে। নতুন নতুন মুখ যাত্রী হিসেবে উঠে খালি হওয়া সিটগুলো দখল করে নিচ্ছে। অনেকদিন
বাসে চলাচলের পর একটা জিনিস আমি আবিষ্কার করেছি। বাসে ওঠার পর যে সিটটাতে আমি বসি
না নামা পর্যন্ত সেই সিটটাকে আমার আপন মনে হয়। মনে হয় সিটটার মালিকানা একান্তই
আমার। সবুজ শ্যামল প্রকৃতি চারপাশে। সকালের রোদ উত্তপ্ত হতে শুরু করেছে। মাঠজোড়া
সবুজ ধানক্ষেত। সেই সবুজের বুক চিরে সাপের মত এঁকে বেঁকে চলেছে পিচকালো রাস্তা।
সেই ফাঁকা রাস্তা ধরে বাসটা ছুটে চলেছে মেহেরপুরের দিকে। বাতাসের সো সো শব্দ কানে
লাগে মাঝে মাঝে। অনেকটা সময় পেরিয়ে গেছে। বাসের অনবরত ঝাঁকুনিতে চোখে ঝিমুনি চলে
এলো। ঘুমিয়ে পড়েছিলাম কিনা জানিনা। ফারহানার ধাক্কায় তাকিয়ে দেখি বাস মেহেরপুরে
চলে এসেছে। মেহেরপুর গেট পেরিয়ে বাসস্ট্যান্ড। সেখান থেকে আবার বৈদ্যনাথ তলার বাসে
উঠতে হলো। সেই বৈদ্যনাথ তলা এখন মুজিব নগর। ১৯৭১ সালের তৎকালীন এই বৈদ্যনাথ তলায়
বাংলার কিছু মুক্ত প্রাণ দামালের প্রচেষ্টায় স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠন করা হয়। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে তখন পাকিস্তান
সেনাশাসকেরা বন্দি করে পশ্চিম পাকিস্তানের কারাগারে আটকে রেখেছেন।
মেহেরপুর বাসস্ট্যান্ট থেকে ছোট খাট একখান মুড়ির
টিনে উঠে বসলাম। পুরো বাস ভরতে বেশ সময় লাগলো। সিটগুলো পূর্ন হওয়ার পরেও দাঁড়ানো
সিটগুলো ভরার জন্য অপেক্ষা করতে হলো। লোকাল আর কাঁকে বলে। যখন ‘তিল ঠাঁই আর নাহিরে’
অবস্থায় উপনীত হলো তখন সম্মানীত ড্রাইভার সাহেব যাত্রীগণের প্রতি বিশেষ সদয় হয়ে
বাস স্ট্রার্ট দিলেন। বাস অনতিবিলম্বে শহর
ছেড়ে বাইরে চলে এলো। এখানেও সবুজ সতেজ প্রকৃতি। কিন্তু হঠাৎ প্রকৃতি লাফাতে শুরু
করলো। প্রথম প্রথম ছোট ছোট জাম্প দিলেও এখন হাই জাম্প দেয়া শুরু করলো। আসলে সবুজ
ধানের মাঠ লাফাচ্ছিলো না। লাফাচ্ছিলো আমাদের বাস খানা। রাস্তার বেহাল অবস্থা। ছোট
বেলায় গ্রামের রাস্তায় পানি জমে যেত। আমরা তখন ছোটরা শুকনো যায়গা দেখে লাফিয়ে
লাফিয়ে রাস্তা পেরিয়ে যেতাম। এই গর্ত সংকূল ভাঙাচোরা রাস্তায় আমাদের বাসখানা
সেভাবে ভালো জায়গা দেখা লাফিয়ে চলছে কিনা বুঝতে পারছি না। আমি সামনের সিট শক্ত করে
ধরে বসে আছি। যাতে সুইং করে উপরে ছাদের সাথে আমার মাথার সংঘাত না হয়। আপাতত বাসের
ছাদ এবং আমার ব্যক্তিগত ছাদের কোলাকুলি নিবারন করতে সমর্থ হলাম। লম্বা হওয়ার
সুবিধার থেকে অসুবিধা বেশীরে ভাই! ছোট বেলায় আমি কখনো স্কুলের ফার্স্ট বেঞ্চিতে
বসতে পারতাম। আমি সামনে বসলে বাটকু পোলাপাইন গুলো ব্লাকবোর্ড দেখতে পায়না বলে
অভিযোগ তুলে শিক্ষকের দারস্থ হত। স্যাররাও বাধ্য হয়ে কোনার সারিরি কোনার সিটে বসতে
বলতেন। আবার ফাঁকিবাজ পোলাপাইন যারা স্যারের চোখ ফাঁকি দিয়ে দুদন্ড ঘুমিয়ে নিতে
চায় তারা আমাকে সামনে বসাতে চাইতো। তাদের ধারণা ছিলো আমার মত পাহাড়ের কাঁধের উপর
দিয়ে তাদের ঘুমন্ত মুখ দেখার সাধ্যি স্যারের নেই। কতই বা লম্বা আমি। পাঁচফুট দশ
ইঞ্চি মাত্র। উচ্চতার শেষেও দেখি মাত্র লাগিয়ে দিলাম। ছোট বেলায় আব্বুর কাছ থেকে
শিখেছিলাম সকল টাকার অংকের শেষে মাত্র লিখতে হয়। সে দুই টাকা হোক আর দুই হাজার
টাকা হোক। ছোটবেলার দুই হাজার টাকা কিন্তু দুই কোটি টাকার থেকে বেশী। সেই সময়ে
ধারণা ছিলো দুই হাজার টাকায় চাইলে সব কিছু কিনে ফেলা যায়। তো সেই দুই হাজার টাকার
পিছনেও মাত্র লাগালে কি পরিমাণ বিস্মিত হয়েছিলাম বুঝতেই পারছো।
মুজিবনগর পৌঁছে গেছি। সামনে গেট। রাস্তার পাশ ঘেঁসে
দুপাশে অনেক গুলো দোকান। দোকান বলতে রাস্তার উপর পলিথিন বিছিয়ে পসরা সাজিয়ে বসেছে
সবাই। খেলনা সামগ্রীই বেশী। গেট পেরিয়ে ঝকঝকে তকতকে রাস্তা। এতক্ষন ভাঙাচোরা
রাস্তার ঝাঁকুনির পর সুন্দর এই রাস্তা দেখে আবেগে আপ্লুত হয়ে পড়লাম। বড়
প্রশান্তিময় মনে হলো রাস্তাকে। আমাদের নির্দিষ্ট কোন আইডিয়া নেই। কোথায় কোথায় যেতে
হবে। আমরা একপাশ দিয়ে হাঁটা শুরু করলাম। বিশাল বিশাল আমগাছ ছায়া দিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
গাছের নিচে আমের মুকুল পড়ে আছে। আমাদের এলাকায় আমের মুকুলকে বলা হয় ‘বইল’। অনেক
জায়গায় এগুলোকে আমের গুঁটি বলতে শোনা যায়। একজন মহিলা লম্বা হাতলওয়ালা ঝাঁড়ু দিয়ে
ঝাড় দিয়ে শুকনো আমপাতা জড়ো করছে। এলাকাটা সে ধূলোময় করে তুলেছে। আমরা পাশ কাটিয়ে
এগিয়ে গেলাম। আমবাগান ধরে দুই বন্ধু নিরবে হেঁটে চলেছি। বিশাল এই মহীরূহগুলো
বাংলার ইতিহাসের নিরব সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে আছে। যে সাক্ষ্য আওয়ামী বিএনপি কারো
পক্ষেই নয়। সত্যের পক্ষে।
যেহেতু মেহেরপুর তথা মুজিবনগর ভ্রমন কাহিনী লিখতে
বসেছি এবং যেহেতু জায়গা ঐতিহাসিক নিদর্শন হিসেবে স্বীকৃত সেহেতু সময়ের প্রয়োজনেই
আমার কিছুটা ইতিহাস আওড়ে নেয়া উচিত। ২৫ শে মার্চ বাঙালীর ইতিহাসে একটি কালো রাত।
এই রাতে পাকিস্তান সামরিক বাহিনী অপারেশান সার্চলাইটের নামে বাঙালির উপর ধ্বংসযজ্ঞ
শুরু করে। এই রাতেই বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমানকে গ্রেফতার করা হয় হয়। ২৭ মার্চ
চট্রগ্রামের কালুরঘাট বেতারকেন্দ্র থেকে মেজর জিয়াউর রহমান বঙ্গবন্ধুর পক্ষে
বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষনা করেন। সেই ঘোষনা বহির্বিশ্বের কাছে বাংলাদেশের
সার্বভৌম পরিচয় তুলে ধরে।
আওয়ামীলীগের অন্যান্য নেতার মত তাজউদ্দিন আহমদে
নিজবাসভবন ছেড়ে আত্মগোপন করেন। প্রথমে আত্মরক্ষা
তারপর প্রস্তুতি এবং সর্বশেষে পালটা আক্রমণ এই নীতিকে সাংগঠনিক পথে পরিচালনার জন্য
সরকার তিনি সরকার গঠনের চিন্তা করতে থাকেন। বাংলাদেশ সরকার গঠনের
পরিকল্পনাকারী তাজ উদ্দিন আহমেদ। এবং তার পরিকল্পনা সফল হয়। ১০ এপ্রিল ১৯৭১,
বঙ্গবন্ধুকে রাষ্ট্রপতি ঘোষনা করে। সৈয়দ
নজরুল ইসলামকে উপরাষ্ট্রপতি এবং বঙ্গন্ধুর অনুপস্থিতিতে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
নির্বাচিত করা হয়। তাজউদ্দীন আহমদকে প্রধানমন্ত্রী,ক্যাপ্টেন এম মনসুর
আলী,খন্দকার মোশতাক আহমেদ ও এ এইচ এম কামরুজ্জামানকে
মন্ত্রিপরিষদের সদস্য নিয়োগ করা হয়। ১১ এপ্রিল এম এ জি ওসমানীকে প্রধান সেনাপতি
নিযুক্ত করা হয়। প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন ১১ এপ্রিল বাংলাদেশ বেতারে মন্ত্রিপরিষদ
গঠনের ঘোষনা দিয়ে ভাষণ প্রদান করেন।
এরপর ১৭ এপ্রিল
১৯৭১ পূর্ব ঘোষনা মোতাবেক কুষ্টিয়া জেলার মেহেরপুরে বৈদ্যনাথ তলার এক আমবাগানে
মন্ত্রিপরিষদের শপথগ্রহণ অনুষ্ঠান আয়োজিত হয়। সকাল ৯ টা থেকেই সেখানে নেতৃবৃন্দ
ও আমন্ত্রিত অতিথিদের আগমন শুরু হয়। দেশি বিদেশি প্রায় ৫০ জন সাংবাদিক উক্ত
অনুষ্ঠানে উপস্থিত ছিলেন। বেলা ১১টায় শপথ অনুষ্ঠান শুরু হয়। কোরান তেলাওয়াত ও
জাতীয় সংগীত পরিবেশনের মধ্য দিয়ে অনুষ্ঠানের সূচনা হয় এবং শুরুতেই বাংলাদেশকে 'গণপ্রজাতন্ত্রী
বাংলাদেশ' রূপে ঘোষনা করা হল। এরপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি
একে একে প্রধানমন্ত্রী ও তার তিন সহকর্মীকে পরিচয় করিয়ে দিলেন। এরপর নূতন
রাষ্ট্রের সশস্ত্র বাহিনীর প্রধান হিসেবে কর্নেল এম এ জি ওসমানী এবং সেনাবাহিনীর
চিফ অব স্টাফ পদে কর্নেল আবদুর রবের নাম ঘোষণা করলেন। এরপর সেখানে বাংলাদেশের
স্বাধীনতার ঘোষণাপত্র পাঠ করা হয়। এই ঘোষণাপত্র এর আগেও ১০ এপ্রিল প্রচার করা হয়
এবং এর কার্যকারিতা ঘোষণা করা হয় ২৬ মার্চ ১৯৭১ থেকে। ঐদিন থেকে ঐ স্থানের নাম
দেয়া হয় মুজিবনগর। ঐ অনুষ্ঠানে রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী উভয়েই বক্তব্য পেশ
করেন।প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দীন আহমদ তার ভাষনে বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার
প্রেক্ষাপট বর্ণনা করেন। ভাষণের শেষাংশে তিনি বলেন, “বিশ্ববাসীর
কাছে আমরা আমাদের বক্তব্য পেশ করলাম, বিশ্বের আর কোন জাতি
আমাদের চেয়ে স্বীকৃতির বেশি দাবিদার হতে পারে না। কেননা, আর কোন জাতি আমাদের চাইতে কঠোরতর সংগ্রাম করেনি। অধিকতর ত্যাগ স্বীকার
করেনি।জয়বাংলা”।
এই সরকার গঠনের
সঙ্গে সঙ্গে পাকিস্তানী সামরিক বাহিনীর বিরূদ্ধতা যুদ্ধের রূপ নেয় এবং স্বাধীন ও
সার্বভৌম রাষ্ট্র হিসাবে বাংলাদেশের প্রতিষ্ঠার সম্ভাবনা প্রতিভাসিত হয়ে ওঠে। তাজউদ্দিন
আহমেদকে জানাই লাল সবুজ সালাম।
মুজিবনগরকে
আকর্ষনীয় পর্যটন স্পট হিসেবে গড়ে তুলতে সরকার বেশ কিছু প্রকল্প হাতে নিয়েছে। এর
মধ্যে একটি হচ্ছে বাংলাদেশের বিশাল একটি ভূ-মানচিত্র। এই মানচিত্রে বাংলাদেশের সকল
জেলার দর্শনীয় স্থানগুলোকে ছোট রেপ্লিকা দিয়ে ফুটিয়ে তোলা হয়েছে। মানচিত্রে আমার
নিজ জেলা খুলনা খুঁজে পেয়ে আমি বিমোহিত হলাম। গরমে গলা শুকিয়ে কাঠ। আইসক্রিম
কিনলাম। চকচকে আইসক্রিমের প্যাকেট। দামটাও চড়া। কিন্তু ভেতরে শুধু বরফ জমিয়ে রাখা
হয়েছে। আইসক্রিম ওয়ালাকে কিছু বলার আগেই সে নাগালের বাইরে চলে গেলো।
এরপর দেখতে গেলাম
মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। আজ ১০ এপ্রিল ২০১০ সাল। ১০৭১ সালের এই দিনে এই বৈদ্যনাথতলার
আমবাগানে অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার গঠিত হয়। সেই পূন্যস্মৃতিকে বাঙালী স্মরন রাখতে
গঠন করেছে মুজিবনগর স্মৃতিসৌধ। তবে আমি ব্যক্তিগতভাবে বিশ্বাস করি এখানে
তাজউদ্দিনের নামেই কিছু থাকা উচিত ছিলো। বঙ্গবন্ধু তার জীবোদ্দশায় কখনো মুজিবনগর
যান নাই। স্বাধীন বাংলাদেশ সরকার গঠনের রূপকার তাজউদ্দিন আহমেদকে কেন বাংলাদেশের
ইতিহাস স্বীকার করে না আমি বুঝতে পারি না। যার যেটুকু কৃতিত্ব সেটুকু তাকে দেওয়া
কি উচিত নয়!
বৃত্তাকারভাবে
সজ্জিত ২৩ টি দেয়ালের সমন্বয়ে এই স্মৃতিসৌধটি নির্মান করা হয়েছে। ১৯৪৭ থেকে ১৯৭১
এই ২৩ বছরের স্বাধীনতা আন্দোলনের প্রতীক হিসেবে দাঁড়িয়ে আছে এই ২৩ টি দেঁয়াল।
স্থপতি তানভির করিম। ১৭ এপ্রিল অস্থায়ী বাংলাদেশ সরকার শপথ নেন। আর সাত দিন বাদে
১৭ এপ্রিল। এই উপলক্ষ্যে স্মৃতিসৌধ ধোয়া মোছা চলছে। একজন আনসার সদস্য লাঠি হাতে
বসে আছে। কাউকে স্মৃতিসৌধে উঠতে দেয়া হচ্ছে না। দূর থেকে ছবি তুলেই আমাদের নিবৃত
হতে হলো। বলা হলো ১৭ এপ্রিল প্রধানমন্ত্রী আসবেন। তাই এই কয়দিন কাউকে উঠতে দেয়া
হবে না। সব রাগ গিয়ে পড়লো প্রধানমন্ত্রীর উপর। সাতদিন পরে আসবেন। আর এখন
স্মৃতিসৌধে উঠতে না দেয়ার মানে কি! আমেরিকায় হোয়াইট হাউসেও তো এর থেকে সহজে প্রবেশ
করা যায়।
হারান সরকার বলে
একটা লোকের সাথে পরিচয় হলো। খুব সম্ভবত হারান সরকার। নামটা নিয়ে কিছুটা কনফিউজড
হয়ে যাচ্ছি। কথা বার্তা ভালোই। একটু বেশী কথা বলে। তাকে নিয়ে পেপারে টিভিতে
প্রতিবেদন বেরিয়েছে। মুক্তিযুদ্ধে তিনি সব হারিয়েছেন। তিনিই আমাদের স্মৃতিসৌধের
পার্ট বাই বার্ট বর্ণনা করে বোঝাতে লাগলেন।
এরপর আমরা চললাম
সীমান্ত দেখতে। খুব কাছেই ভারতীয় সীমান্ত। রিকশা নিয়ে চলে গেলাম। ছোট খাটো একটা
মেলা বসেছে। অনেকটা গ্রামীন মেলার আবহ। বাহারী পন্যের বিকিকিনি চলছে। বাংলাদেশের
শেষ প্রান্তে এসে পৌঁছেছি। এই সোজা রাস্তাটা চলে গেছে ভারতের ওদিকে। পথের মাঝে
একটা বাঁশ আড়াআড়িভাবে বেঁধে রাখা হয়েছে। এই বাঁশটাই বাংলাদেশের সীমান্ত নির্ধারণ
করেছে। ওই যে দূরে গাছগুলো দেখা যাচ্ছে ওগুলো সব ভারতের। পা বাড়ালেই ভারত।
মেলাতে ঘুরতে শুরু
করলাম। লাস্যময়ী এক কিশোরীকে দেখলাম। উচ্ছ্বল প্রাণ চঞ্চল। এ দোকান সেই দোকান ঘুরে
বেড়াচ্ছে। মেয়েটার চোখে সানগ্লাস। মেয়েটার পাশে মোটাসোটা শক্ত চেহারার একজন মহিলা।
তার চোখেও সানগ্লাস। মহিলার চোখ আমি দেখতে না পেলেও এটুকু বুঝতে পারলাম মহিলা
সরাসরি আমার দিকে তাকিয়ে আছেন। আমার চোখের ফোকাস তিনি ধরে ফেলেছেন। আমি অন্যদিকে
চোখ ফিরিয়ে নিলাম। আমি নিশ্চিত এই মহিলার চোখে ব্রম্মশক্তি থাকলে আজ আমি নিশ্চিত
পূড়ে ছাই হয়ে উড়ে যেতাম। কি কঠিন মুখরে বাবা! মেয়েটাও কম যায় না। বারবার আমার
সামনে দিয়ে আসা যাওয়া করতে লাগলো। আরে ভাই শোল মাছের মুখের সামনে ব্যাং যদি লাফালাফি
করে তবে শোল মাছ স্থির থাকে কিভাবে বলো!
এই ছোট্ট মেলায় আমি
পেঁয়াজু খেয়ে মুগ্ধ হলাম। আজকাল পেঁয়াজু তো নামেই পেঁয়াজু থাকে। পেঁয়াজের জায়গায়
ডালের পরিমান বেশী থাকে। কিন্তু এখানের পেঁয়াজুতে শুধুই পেঁয়াজ। ডালের অস্তিত্ব
সামান্য। মধ্যবয়স্থ একটা লোক পেঁয়াজু ভাঁজছে। ঐ বাঁশঝাড়ের ওপাশেই বাড়ি। তাকে
জিজ্ঞেস করতে বললেন, নিজেদের মাঠের পেঁয়াজ দিয়ে তিনি পেঁয়াজু বানান। ভেজার দেয়ার
দরকার হয় না। দুইজন মানুষ ছেলেপুলে নেই। ফাঁকির টাকা দিয়ে তিনি করবেনটা কি! লোকটার
ব্যবহার আন্তরিক। অনেকক্ষণ তার সাথে বসে গল্প করলাম। মাঠের লোকগুলোকে দেখে জিজ্ঞেস
করলাম, ওরা কারা? জানলাম, এরা বাংলাদেশী কৃষক। মাঠ থেকে পেঁয়াজ তুলছে। সেই মাঠের
কিনারায় দাঁড়িয়ে ইন্ডিয়ার দিকে তাকালাম। মেহেরপুরের পশ্চিমাংশে উত্তর-দক্ষিণে
ভারতের সাথে ৬০ কিমি বিস্তৃত সীমানা আছে। একসময় আমরা ছিলাম এক ভূখন্ড। ইচ্ছে করলেই
আমি ছুটে যেতে পারতাম ওইপাশে। এক শ্রেণীর ব্যর্থ শাসকদের অকল্যাণে এখন দেশে দেশে
কাটা তারের বেড়া।
আবার সেই ভাঙাচোরা
রাস্তা সাঁতরে মেহেরপুর সদরে চলে এলাম। দুপুরে খাওয়া হয় নাই। প্রচন্ড ক্ষুধা
পেয়েছে। রেস্টুরেন্ট খুঁজে পাচ্ছি না। শেষমেষ একটা যেনতেন রেষ্টুরেন্ট পেয়ে ঢুকে
পড়লাম। খাবারের মান যাচ্ছে তাই। কোন মতে খেয়ে বাসে উঠে পড়লাম। এবার ফেরার পালা।
হাতে সময় থাকলে আরো কিছু দর্শনীয় স্থান ঘুরে দেখা যেত। যেমন, আমদহ গ্রামের
স্থাপত্য নিদর্শন, সিদ্ধেশ্বরী কালী মন্দির, আমঝুপি নীলকুঠি, ভাটপাড়ার নীলকুঠি, সাহারবাটি, ভবানন্দপুর মন্দির ইত্যাদি।
ফিরে যাচ্ছি।
সীমান্ত আর ইতিহাসের খুব কাছ থেকে। বুকের মধ্যে এক অন্যরকম ভালোলাগা কাজ করছে।


Post a Comment