সাম্প্রতিককালে বাংলাদেশের বড় দুটি রাজনৈতিক দলের কল্যাণে
আমরা আমাদের জাতীয় পরিচয় সঙ্কটে পড়েছি। ক্ষমতাশীন আওয়ামী লীগের দাবি আমাদের জাতীয়তা বাঙ্গালী
অন্যদিকে বিএনপি আমাদের শিখিয়ে গেছে আমাদের জাতীয়তা বাংলাদেশী। অস্থির এই বিতর্কে আমি নাক
গলিয়ে একটু বোঝার চেষ্টা করতে চাই আমার আসল জাতীয়তা কী?
সুপ্রাচীনকাল থেকে গঙ্গা ভাগীরথীর
তীর ঘেঁষে একদল মানুষ বাস করত। কালের স্রোতে যাদের বিস্তার ঘটে বঙ্গোপসাগরের কিনার
পযন্ত। এই বিশেষ
এলাকার মানুষদের কে বলা হত বাঙ্গালী। গঙ্গা পদ্মার এই বিশাল এলাকা বংগ নামে পরিচিত ছিল। আবুল ফজলের লেখা হতে জানা যায়
যে বংগ এলাকার ভূমি পৃথকীকরনের জন্য জমিতে প্রচুর পরিমানে আইল বা আল দেওয়া হত। বংগের সাথে পরবতীতে আল যুক্ত
হয়ে বংগাল শব্দের উদ্ভব ঘটে। আর বংগ এলাকার লোক যে বিশেষ ভাষায় কথা বলত তাকে বলা
হল বাংলা। আর বাংলা
ভাষী এই লোকগুলোকেই বলা হল বাংগালী।
কিন্তু এই বাংলাভাষী মানুষের
মাঝে বসবাসকারী অন্য ভাষাভাষী মানুষেরদের কে বাংগালী বলা হতনা। তারা তাদের নিজ ভাষা পরিচয়ে
পরিচিত হত। এরপর আমরা
ইতিহাস বইয়ের একসাথে অনেকগুলো পৃষ্ঠা উলটে সামনে এগিয়ে যাব। সাতচল্লিশে এই বংগ অঞ্চল বিভক্ত হয়ে ইন্ডিয়া আর পাকিস্তানে
আলাদা হয়ে গেল। ইনডিয়ার ভাগের
নাম হল পশ্চিম বাংলা আর পাকিস্তানের ভাগের নাম হল পূ্র্ব বাংলা। একাত্ত্বরের মহান মুক্তিযুদ্ধে পূব বাংলা একটি স্বকীয়
নাম পেল, বাংলাদেশ, যে নামে আমরা আজো গর্ববোধ করি।
সেই বাংলাদেশের মানুষগুলো আজ
তাদের জাতীয় পরিচয় খুঁজে ফিরছে। কি হওয়া উচিত তাদের জাতীয় পরিচয়? বাংগালী নাকি বাংলাদেশী। পৃথিবীর ইতিহাস ঘেঁটে দেখা যায় আমাদের পরিচয় হওয়া
উচিত বাংলাদেশী। পৃথিবীর অনেক
দেশের ভাষা ইংরেজী তবুও তারা তাদের দেশের পরিচয়ে পরিচিত। পৃথিবীতে ইংরেজ বলে সামষ্টিক জাতি আছে কিন্তু নির্দিষ্ট
কোন জাতি নেই। সেই একই ভাবে
আমরা সারা পৃথিবীর বাংলাভাষী মানুষেরা বাঙ্গালী বলে পরিচিত হব। কিন্তু স্বাধীন বাংলাদেশের
বাঙ্গালী বলে আমাদের একটি নির্দিষ্ট পরিচয় থাকা উচিত। আর তা অবশই বাংলাদেশী।
আওয়ামী লীগ কেন আমাদের বাঙ্গালী পরিচয় দিতে এত আগ্রহী?
কারন তারা ভাষাগত একটা ভূলদাবী করে ফেলেছে। বংগবন্ধুকে বাঙ্গালী জাতির
জনক হিসেবে পরিচয় করে দিয়েছে সারা বিশ্বের সামনে। অথচ তিনি বাঙ্গালী জাতির জনক নন, তিনি বাংলাদেশী জাতির জনক। পশ্চিম বংগের
বাঙ্গালীরা কখনোই বংগবন্ধুকে তাদের জাতির জনক হিসেবে মেনে নেবে না। তাহলে কেন একটি ভূল ভিত্তিকে
পাকা করতে আমাদের জাতীয় পরিচ্য মুছে ফেলা ? বাংলাদেশে বাসকারী ক্ষুদ্র ভাষাভাষী
যেমন চাকমা, সাঁওতাল, মগ,
কোঁচ, কুকি, খাসিয়া
কি করে বাঙ্গালী হয়? কেন তাদের ভাষাগত পরিচয়ের এত অবমূল্যায়ণ
করা। পৃথিবীর সব
জাতি যেখানে আপন পরিচয়ে পৃথিবীর দরবারে হাজির হতে চায় সেখানে আমার কেন চাইব আমাদের
স্বকীয় পরিচয় মুছে ফেলে সারাবিশ্বের সব বাঙ্গালীর মাঝে বিলীন হয়ে যেতে!
তবে আমি বিশ্বাস করি আমাদের ভাষাতাত্মিক পরিচয়ে আমরা বাঙালী কিন্তু জাতি হিসেবে আমরা বাংলাদেশী।
Post a Comment