গ্যালিলিও গ্যালিলি ইতালির পিসা নগরীতে ১৫৬৪ সালের ১৫ নভেম্বর জন্মগ্রহন করেন। তিনি ছিলেন পিতা মাতার সপ্তম সন্তানের মধ্যে জেষ্ঠতম। তার বাবা ভিনসেনজো গ্যালিলি ছিলেন একজন সঙ্গীত বিশারদ এবং তুলার ব্যবসায়ী। সেই সময়ে ডাক্তারদের বেশ নাম যশ ছিলো। তাদের আয় ইনকাম মন্দ ছিলো না। ভিনসেঞ্জো ছেলেকে ডাক্তারী পড়ানোর বাসনা করলেন। তিনি গ্যালিলিও গ্যালিলিকে পড়াশুনা করানোর জন্য ১১ বছর বয়সে জেসুইট মনাসটেরিতে ভর্তি করে দিলেন।
বিজ্ঞান না ধর্মের পথঃ সাধরনত মিশনারী স্কুল গুলোতে ধর্মের উপর বেশী শিক্ষা দেয়া হয়। তখন ধর্ম আর বিজ্ঞান মুখোমুখি অবস্থায় দাঁড়িয়ে আছে। কেউ কাউকে বিশ্বাস করে না এরকম অবস্থা। চার্চ ধর্মের নামে বিজ্ঞানের উপর খাড়া উচিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। গ্যালিলিও গ্যালিলি জেসুইটে অনেক কিছু শিক্ষা লাভ করলেন। জ্ঞান শিক্ষার প্রতি তার অদম্য আগ্রহ। চার বছর কেটে গেলো। এরপর গ্যালিলিও গ্যালিলি তার বাবা ভিনসেঞ্জো গ্যালিলিকে জানালো যে সে বিজ্ঞান নয় ধর্ম শিক্ষা করতে চায়। ভবিষ্যতে সে একজন সাধু (মংক) হতে ইচ্ছুক। ভিনসেঞ্জো ছেলের এই সিদ্ধান্তে আশাহত হলেন। তিনি চান না তার জেষ্ঠপুত্র সন্যাসীর জীবন গ্রহন করুক। তিনি গ্যালিলিও গ্যালিলিকে মনাসটেরি থেকে ছাড়িয়ে বাড়ি ফিরিয়ে আনলেন। ঘরে বসে আরো দুটি বছর পার করে দিলেন গ্যালিলিও গ্যালিলি। এরপর ১৭ বছর বয়সে গ্যালিলিও গ্যালিলি পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে পিতার ইচ্ছানুযায়ী মেডিসিনে ভর্তি হলেন। ভিনসেঞ্জো এবার অনেক খুশী হলেন।
সরল দোলকের সুত্রঃ বাইশ বছর বয়সী গ্যালিলিও গ্যালিলি ক্যাথেড্রালে গেছে সেদিন। মাথার উপর একটি দোলক দুলছে। হঠাৎ গ্যালিলিও গ্যালিলি’র মাথায় চিন্তা এলো দোলকটির সামনে পিছনে যেতে ঠিক কতটি সময় লাগে? সে বাসায় ফিরে লম্বা ও খাটো সুতা ব্যবহার করে পরীক্ষা চালালো। দোলকটি সামনে পিছনে যেতে সমান সময় নিলো। গ্যালিলিও গ্যালিলি এমন কিছু আবিষ্কার করল যা আগে কেউ করেনি। গ্যালিলিও গ্যালিলি সুত্রকে কাজে লাগিয়ে তৈরী হলো সরল দোলক । সরল দোলকের সুত্রের উপর ভিত্তি করে সকল ঘড়ি তৈরী করা হয়। সরল দোলকের সুত্র গ্যালিলিও গ্যালিলিকে পরিচিতি এনে দিলো।
একমাত্র অংক ছাড়া অন্য সকল বিষয়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি’র ফলাফল খারাপ হচ্ছে। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গ্যালিলিও গ্যালিলি’র পরিবারকে জানালো এরকম হলে তাদের ছেলে বিশ্ববিদ্যালয় থেকে কোন ডিগ্রি নিয়ে বের হতে পারবে না। ভিন্সেঞ্জো আবার চিন্তায় পড়লেন। ছেলেটা তার হাড় মাস জ্বালিয়ে খেলো। গনিতবিদ তুসকান কুওর্টের তত্বাবধানে গ্যালিলিও গ্যালিলিকে গণিত অধ্যায়নে রাখা হলো। ভিন্সেঞ্জো স্বস্তি পেলেন। অংকবিদদের কামাই রোজগার কম নয়। কিন্তু গ্যালিলিও গ্যালিলি বিশ্ববিদ্যালয় ডিগ্রি অর্জনের আগেই বিশ্ববিদ্যালয় ছেড়ে দিলেন।
বেঁচে থাকার তাগিদে গ্যালিলিও ছাত্র পড়ানো শুরু করলো। অংকের টিউশনি করলে তার জীবনের উদ্দেশ্য ছিলো বড় কোন বিশ্ববিদ্যালয়ে গনিত বিভাগে চাকুরী করা। সে অনেক জায়গায় আবেদন করলো। কিন্তু কেউই তার প্রতিভার মূল্যায়ণ করলো না। তারা গ্যালিলিও গ্যালিলি’র পরিবর্তে অন্য প্রার্থীদের নির্বাচন করলেন। ভাসমান কিছু বস্তু নিয়ে গ্যালিলিও গ্যালিলি গবেষনা চালিয়ে যেতে থাকলেন। তিনি একটি মাপযন্ত্র নির্মান করলেন। এই যন্ত্রের সাহায্যে তিনি নির্ণয় করতে সক্ষম হন সোনা পানির তুলনায় ১৯.৩ গুন ভারী।
সাহিত্যের উপর একটি আলোচনা গ্যালিলিও গ্যালিলি’র ভাগ্য খুলে দিলো। আকাদেমি অফ ফ্লোলেন্স শতবর্ষ পুরাতন বিতর্ক দান্তের নরকের অবস্থান, আকার আকৃতি নিয়ে আলোচনা করতে চাইলো। গ্যালিলিও গ্যালিলি একজন বৈজ্ঞানিকের দৃষ্টিকোন থেকে বিষয়টি ব্যাখ্যা করলেন। উপস্থিত দর্শক শ্রোতা গ্যালিলিও গ্যালিলি’র ব্যাখায় সন্তুষ্ট হলেন। তাকে পিসা বিশ্ববিদ্যালয়ে তিন বছরের জন্য শিক্ষাদানের জন্য নিযুক্ত করা হলো। এই সেই বিশ্ববিদ্যালয় যারা গ্যালিলিও গ্যালিলিকে একটি সনদ দিতে রাজী হয় নাই।
গ্যালিলিও গ্যালিলি যখন বিশ্ববিদ্যালয়ে আসলেন তখন এরিষ্টটলের একটি সুত্রের উপর ব্যাপক তোলপাড় হচ্ছে। ভারী বস্ত হালকা বস্তুর তুলনায় দ্রুত নিচে পড়ে। গ্যালিলিও গ্যালিলি এটা পরীক্ষার মাধ্যমে প্রমান করতে চাইলেন। পাশেই আছে পিসার হেলানো টাওয়ার। ৫৪ মিটার উচূ এই টাওয়ারে গ্যালিলিও গ্যালিলি বেয়ে উঠে গেলেন। সাথে নিলেন বিভিন্ন আকারের বিভিন্ন ওজনের বল। টরে পেনডেন্টে ডি পিসা ১১৭৩ সালে থেকে ১৩৫০ সালের মধ্যে নির্মিত হয়। পিসার হেলানো টাওয়ারটি এখন ৩.৯৭ ডিগ্রি কোনে হেলে আছে। গ্যালিলিও গ্যালিলি টাওয়ারের শীর্ষদেশ থেকে বিভিন্ন আকৃতির বলগুলো গড়িয়ে দিলেন। নিচে ছাত্র- প্রফেসর- জনতার বিশাল ভীড়। সবাই অবাক হয়ে লক্ষ্য করলেন সব বল গুলো একই সাথে একই সময়ে ভূমিতে এসে পতিত হলো। এরিষ্টটল ভূল ছিলেন।
সহকর্মীদের সাথে গ্যালিলিও গ্যালিলি খারাপ ব্যবহার করতেন। একজন জুনিয়র শিক্ষকের পক্ষে সিনিয়রদের সাথে খারাপ ব্যবহার করে টিকে থাকা অসম্ভব ব্যাপার। বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ গ্যালিলিও গ্যালিলি সাথে তিন বছর শেষে চুক্তি আর নবায়ন করতে রাজী হলোনা। গ্যালিলিও গ্যালিলি পদুয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে চলে গেলেন। ১৫৫৩ সালে গ্যালিলিও গ্যালিলি অনেক টাকার প্রয়োজন হলো। বাবার মৃত্যুর পরে গ্যালিলিও গ্যালিলি এখন পরিবারের প্রধান। বোনের বিয়ের যৌতুক পরিশোধ করতে গ্যালিলিও গ্যালিলিকে প্রচুর ঋণ নিতে হলো।
জ্যোতির্বিদ্যাঃ গ্যালিলিওকে বলা হয় জ্যোতির্বিদ্যার জনক। জ্যোতির্বিদ্যায় গ্যালিলিওর অবদান অল্প কথায় আলোচনা করা অসম্ভব। তবুও চেষ্টা করে দেখা যাক।
গ্যালিলিও বিজ্ঞানের জগতে পরিমাণগত পরিমাপের পদ্ধতির গোড়াপত্তনে অগ্রদূতের ভূতিকা পালন করেন। গানিতিক সুক্ষতার মানদন্ডে তার এই পরিমাপগত ফলাফল সঠিক বলে প্রমানিত হয়েছে। ভিন্সেঞ্জো সুরকার ছিলেন একথা আমি আগেই বলেছি। তিনিও কিছু পরীক্ষা নিরীক্ষা চালান। সুর সৃষ্টিকারী যন্ত্রের উপর পরীক্ষা চালিয়ে তিনি প্রমান করেন, একটি টানা তারের ক্ষেত্রে পিচ টানের বর্গমূলের সমানুপাতিক।
১৬০৯ সালে গ্যালিলিও উন্নত ধরনের দূরবীক্ষন যন্ত্র আবিষ্কার করেন। তিনি তার নব আবিষ্কৃত টেলিস্কোপের স্বার্থক ব্যবহারিক প্রয়োগ ঘটান। ১৬০৮ খ্রীষ্টাব্দে ওলন্দাজ চশমা নির্মাতা লিপেরশাইম তার নির্মিত এক দূরবীক্ষণ যন্ত্রের কথা প্রকাশ করেন। সেই বছরেই এই অদ্ভুত কাচ নির্মিত যন্ত্রের কথা গ্যালিলিও জানতে পারেন। তিনি তার এক রচনায় লিখেছেন: “প্রায় ১০ মাস পূর্বে আমার কাছে সংবাদ পৌঁছে যে জনৈক ওলন্দাজ চশমা নির্মাতা এমন এক যন্ত্র আবিষ্কার করেছেন যার দ্বারা দূরবর্তী বস্তুদের নিকটবর্তী বস্তুর মতো স্পষ্ট দেখা যায়। এ খবর পাওয়া মাত্র আমি নিজে কিভাবে এরকম একটি যন্ত্র নির্মাণ করতে পারি তা চিন্তা ভাবনা করতে লাগলাম।” গ্যালিলিও দুরবীক্ষনের উন্নতি সাধ্ন করে বস্তুর ৩০ গুন বড় বিবর্ধিত প্রতিবিম্ব দেখতে সক্ষম হলেন।
১৬১০ সালে সাইড্রিয়াস নানসিয়াস বইটি প্রকাশিত হয়। দুরবীক্ষনের সাহায্যে জোতির্বিদদের দেখা প্রথম পর্যবেক্ষনের ফলাফল এই গ্রন্থে প্রকাশ করা হয়। চাঁদের পৃষ্ঠের খাদ, ছোট-বড় অনেক দাগ ইত্যাদি বিষয় নিয়ে এই গ্রন্থে আলোচিত হয়। ভূপৃষ্ঠের ন্যায় চাঁদের উপরিভাগে যে পাহাড়, পর্বত, উপত্যকা, নদী, গহ্বর, জলাশয় প্রভৃতির দ্বারা গঠিত গ্যালিলিও এইরূপ অভিমত ব্যক্ত করেন। দূরবীক্ষণ যন্ত্রে বড় বড় কাল দাগ দেখে তিনি তাদের সমুদ্র মনে করেছিলেন, পরে অবশ্য এই ধারণা ভুল প্রমাণিত হয়।
খালি চোখে অদৃশ্য অসংখ্য নক্ষত্রের অস্তিত্ব দূরবীক্ষণ যন্ত্রে ধরা পড়ে। সে সময় খালি চোখে কৃত্তিকা তারামণ্ডলে মাত্র ৬টি নক্ষত্র দেখা যেত; কিন্তু গ্যালিলিও দূরবীক্ষণ যন্ত্রের দ্বারা ৩৬টি নক্ষত্র পর্যবেক্ষণ করেন। সে সময়ের রহস্যময় ছায়াপথ মিল্কিওয়ে পর্যবেক্ষণ করে দেখান যে, তা আসলে অসংখ্য নক্ষত্রের সমষ্টি। দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে তিনি বিষমতারা, নক্ষত্রপুঞ্জ এবং কয়েকটি নীহারিকাও আবিষ্কার করেছিলেন।১৬১০ খ্রীষ্টাব্দের সেপ্টেম্বর বা অক্টোবর মাসে গ্যালিলিও সর্বপ্রথম সূর্যে কতগুলো কালো দাগ পর্যবেক্ষণ করেন। ' ১৬১২ খ্রীষ্টাব্দের মে মাসের পূর্বে তিনি এ আবিষ্কারের কথা প্রকাশ করেন নি। গ্যালিলিওর আগেই ইংল্যাণ্ডের বিজ্ঞানী হ্যারিয়ট, হল্যাণ্ডের জন ফ্যাব্রিসিয়াস ও জার্মানীতে শাইনার সৌর কলংক সম্পর্কিত গবেষণা প্রকাশ করেন। তাই সৌর কলংক আবিষ্কারের গ্যালিলিওকে একক সম্মান দেয়া হয় না।
দূরবীক্ষণ যন্ত্রের সাহায্যে গ্যালিলিও প্রথম পর্যায়ের আবিষ্কারগুলোর মধ্যে বৃহস্পতি গ্রহের উপগ্রহ আবিষ্কার বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। তিনি পরপর কয়েক রাত বৃহস্পতি গ্রহ পর্যবেক্ষণ করে বৃহস্পতির চারটি উপগ্রহ খুঁজে পান। বৃহস্পতির উপগ্রহের আবিষ্কারের মধ্য দিয়ে প্রমাণ হয় যে, ‘গ্রহ-নক্ষত্র প্রভৃতি জ্যোতিষ্করা একমাত্র পৃথিবীকে কেন্দ্র করে ঘুরতে থাকে’, প্রাচীন জ্যোতির্বিদদের এই মতবাদ সত্য নয়। ১৬১০ খ্রীষ্টাব্দের শেষভাগে গ্যালিলিও শনির বলয় আবিষ্কার করেন।
চার্চ এবং গ্যালিলিওর সৌরবাদ নিয়ে সামনে আরেকটি পর্ব লেখার ইচ্ছে আছে।
Post a Comment