এক রোজাদার বিড়াল


আপনি কি বিড়াল পছন্দ করেন? অধিকাংশ মানুষ কিন্তু বিড়াল ভালবাসে বিড়ালও মানুষের সাহচর্য্য পছন্দ করে। দেখবে মানুষের কাছাকাছি গেলে বিড়াল মিউমিউ করে ডাকে আর কাছে গিয়ে তার গায়ে লেজ বুলাতে থাকেবিড়াল কেন মানুষের গায়ে লেজ বুলায় জানো? নিশ্চই জানোনা বিড়ালের লেজ বুলানো নিয়ে দাদাজান মজার গল্প বলতেন বলতেন, বিড়ালের আয়ু খুব কম কিন্তু তারা যদি মানুষের গায়ে লেজ বুলাতে পারে তাহলে তাদের আয়ু বেড়ে যায় সেজন্য তারা মানুরষের গায়ে লেজ বুলানোর ধান্দায় থাকে সবসময় ছোটকালে কতই না ভয় পেতাম এই বুঝি বিড়াল নিজের আয়ু বাঁড়িয়ে নিয়ে আমার আয়ু কমিয়ে দিল

 আবার একশ্রেণীর মানুষ আছেন যাদের কাছে বিড়াল একটি বিরক্তিকর বস্তু। যে কয়জন মানুষ বিড়াল অপছন্দ করেন তাদের মধ্যে আমার আম্মা অন্যতম বিড়ালের একটি বড় বদগুন হলো যেখানে সে বসবে সেখানেই লোম ছড়িয়ে অস্থির করে ফেলে আর বিড়ালের এঁটো খেলে ডিপথেরিয়া হয় এটা তো আজকের দিনে সবারই জানা আম্মা বিড়াল দেখলেই লাঠি হাতে ছেই ছেই করে তাড়া দিয়ে বাড়ীর সীমানা পার করে দেন লাঠি ঊঁচিয়ে ভয় দেখাতেন কিন্তু মারতে দেখতাম না কখনো। একটা মজার ব্যাপার প্রতি বছর রোজার মাসে কোথা থেকে একটা বিড়াল ছানা এসে হাজির হয় আমাদের বাড়ীতে কয়েক বছর আগের কথা আমাদের রান্নাঘরের সামনে বাচ্চা একটা বিড়াল এসে সারাদিন মিউমিউ করত স্বভাবতই আম্মা বিরক্ত হয়ে তাড়িয়ে দিতেন বিড়ালটা ভয় পেয়ে চলে যেত কিন্তু  কিছুক্ষণ পরে সে আবার ফিরে আসত আমি প্রথমে ব্যাপারটা খেয়াল করিনি পরে দেখলাম কাবু একটা বিড়াল ছানা আমি প্রতিদিন রাতের খাবারের পর বিড়াল ছানাটাকে কিছু খাবার দিয়ে আসতাম অল্প অল্প খেত কিন্তু সেটা এত রোগা হয়ে পড়ে যে আর মুখে তুলে খেতে পারে না প্রথম দিকে আম্মা বলত কি না কি রোগ হয়েছে বিড়ালটার , কাছে না যাওয়াই ভালো। কিন্তু আম্মাই আবার রাতের খাবার শেষে কিছু ভাত দিয়ে আসতে বলতে বিড়ালটাকে। বাচ্চা বিড়ালটা কিছু খেত না। আমি বাচ্চাটাকে পলিথিন দিয়ে ধরে খাওয়াতাম দুপুর বেলা রোজার দিনে স্বাধারনত আমাদের ঘরে ভাত থাকে না। একদিন দুপুরে দেখি বিড়ালটার সামনে কিছু ভাত দিয়েছে কেউ। আম্মা ছাড়া আর কে দিবে কিছুদিন পরে বিড়ালটা এতটাই অসুস্থ হয়ে পড়ল যে খেতেই পারত না আমি রাতে আর সেহেরীড় সময় দুইবেলা তাকে খাবার খাওয়ানোর বৃথা চেষ্টা করতাম



  একদিন সকালে ঘুম থেকে উঠে দেখি বিড়াল ছানাটি মরে পড়ে আছে খারাপ লাগল কিন্তু কি বা আর করার ছিল আমার যেখানে চিকিৎসার অভাবে মানুষ মারা যায় সেখানে একটা বিড়ালের চিকিতৎসা করার মত পাগলামী আমি করতে পারতাম না মন যা চায়, সব সময় সেটা করা যায় না বিড়াল ছানাটাকে পলিথিনে ধরে খালে ফেলে দিয়ে এলাম।

লেখাপড়ার পাঠ চুকিয়ে মাসকয়েকের জন্য বেকার হয়েছি মাত্র। থাকি ঢাকার মিরপুরে বর্ধিত পল্লবী আবাসিক এলাকায় রোজার মাসে আমি বাড়ি থাকতে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করি শুরুর দিকে রোজার কয়েকটা দিন ঢাকায় ছিলাম দম বন্ধ হয়ে আসার জোগাড় পাঁচ রোজার দিন বাসের টিকেট কেটে উঠে বসলাম বাসে দৌলতদিয়া পাটুরিয়া ফেরিঘাটে প্রচন্ড জ্যাম কিন্তু বাড়ি ফেরার আনন্দে সেটা কিছুই মনে হল না পদ্মাসেতু প্রকল্প বাস্তবায়ন হলে দক্ষিন বঙ্গের উন্নয়ন সুচিত হবে বলে আমার বিশ্বাস। যমুনা সেতু যেমন উত্তর আধুনিকতার জন্ম দিয়েছে তেমনি পদ্মাসেতু করবে দক্ষিণ আধুনিকতার সূচনা। সন্ধ্যার অল্প আগে বাড়ী পৌঁছে গেলাম হাত মুখ ধুয়ে বারান্দার চৌকি খাঁটে এসে বসলাম। আজ আব্বু লেবুর সরবত বানাচ্ছেন। কিচেনে আম্মা ডুবো তেলে বড়া ভাজছেন চৌকির নিচে একটা বিড়াল ছানা মিউ মিউ করছে আম্মা বিরক্ত হয়ে গজ গজ করে বলছেন, “প্রতিবছর রোজার মাসে কোন জায়গা থেকে এই ঝামেলা এসে জোটে দাঁড়া রোজা শেষ হোক তোর মিউমিউ করা বের করব” দেখলাম বিড়ালটা মোটেও কাবু নয় তার মানে আম্মা যতই চেঁচামেচি করুক , বিড়ালটাকে ঠিকই খেতে দেন

  বিড়াল ছানাটা বেশ লক্ষী সারাদিন কোন খোঁজ দেখিনা কিন্তু খাওয়ার সময় ঠিক হাজির হয়ে যায় ভোররাতে দরজা খুলে দেখি বারান্দার চেয়ারে বাবু হয়ে বসে আছে বিড়াল ছানাটি আমাদের সাথে যেন সেও সেহেরী করবে আমরা খেতে বসি সে খাটের নিচে বসে মিউমিউ করে ডাকে মাছে কাটা রাখার পিরিচ টা নামিয়ে দেই খাওয়া শেষ হলে সে আবার ডাকে

  একটা মজার ব্যাপার কি জানো, বিড়ালটা সারাদিন কিছু খায়না আমি দুপুরের দিকে ভাত দিয়েছি কয়দিন ভাত গুলো নিয়ে চুপচাপ বসে পাহারা দেয় কিন্তু খায়না আম্মা মজা করে বলেন রোজাদার বিড়াল কিছু মানুষ আছে যারা হয়ত এই বিড়ালটার মাঝে অলৌকিক কিছু খুঁজে বের করে ফেলতে পারতেন হয়তো রোজাদার হিসেবে এলাকায় বেড়ালটির নাম চাগিয়ে যেত সবাই দেখতে আসত রোজাদার বিড়াল
  আমরা খারাপ বলেই বিড়ালটা তার এই সুনাম থেকে বঞ্চিত হল আসল ব্যাপারটা হল, বিড়ালটা মাছের কাটা ছাড়া কিছুই খায়না যেহেতু সারাদিন মাছের কাটার ব্যবস্থা থাকেনা তাই সেও কিছু মুখে তলে নারোজার মাসে বাজারে তো আগুন লেগে থাকে মাছের বাজারে তো ঢোকাই যায় না তারপরেও আমরা চেষ্টা করি খাবার তালিকায় মাছ রাখতে, যাতে বিড়ালটার খাওয়ার ব্যবস্থা হয় কারন সেও আমাদের মত অপেক্ষায় থাকে সন্ধ্যা হবার না সন্ধ্যা নয় রাতের খাবারের খাটের নিচে বসে মিউ মিউ করে ডাকে। আম্মা একদিন হেসে ফেলে বললেন, “এমন ভাবে ম্যাঙ ম্যাঙ করে ডাকে মনে হয় মা মা করে ডাকছে।”


২০১৪ সাল। বিড়াল ছানাটি সুস্থ আছে সেটি এখন আর ছানা নয়। বেশ নাদুস নুদুস চেহারা হয়েছে। এখনও সে খাবারের সময় সিড়ির কাছে এসে বসে থাকে। আম্মা বিড়ালটার প্রতি যথারিতি বিরক্ত। তাকে আর ঘরে উঠতে দেয়া হয়। কারণ বছর বছর বাচ্চা দিচ্ছে বিড়ালটি। বাচ্চাগুলো কোথায় যেন চলে যায়। কিন্তু এই বিড়ালটি রয়ে গেছে। খাবার সময় ঠিক হাজির হয়ে যায়। আম্মা বাইরে খাবার দেয় বিড়ালটিকে। বাইরে খাবার দিলে হুলো বিড়াল এসে তার খাবার দখল করে । মাঝে মাঝে আম্মা দাঁড়িয়ে থাকে। যাতে হুলো বিড়ালটা এসে তাকে তাঁড়িয়ে না দেয়। যারা এই লেখাটি পড়লে তারা বিড়ালটির জন্য দোয়া করো আম্মা অসুস্থ। আম্মার জন্যও দোয়া করবে। আর ভালবাস মানুষকে, ভালবাস প্রকৃতির প্রতিটি সন্তানকে স্বামী বিবেকান্দর সুরে বলে যাই জীবে প্রেম করে যেইজন সেইজন সেবিছে ঈশ্বর। 
লাইক এন্ড শেয়ারঃ :
 

Post a Comment

 
আমার ব্লগে বেড়াতে আসার জন্য ধন্যবাদ। কেমন লাগলো আমার ওয়েবসাইটটি? আবার বেড়াতে আসবেন।
কপিরাইট © ২০১৫ My Virtual Home - সকল স্বত্ব সংরক্ষিত।
বই পড়ুন এবং অন্যকে বই পড়তে উৎসাহিত করুন।
অন্যদের দিকে না তাকিয়ে আপনি আপনার অবস্থান থেকে দেশের জন্য মঙ্গলকর কিছু করুন।